ইসরায়েলের বুক চিরে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র
রয়টার্স ও আল জাজিরার প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, শনিবার ভোরে ইয়েমেন থেকে ধেয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্রগুলো শনাক্ত করার পরপরই ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (Arrow ও Iron Dome) সক্রিয় হয়ে ওঠে। দক্ষিণ ইসরায়েলের বিয়ার শেবা এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্রের আশপাশে সাইরেন বেজে উঠলে জনমনে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আইডিএফ সারা দেশে নাগরিকদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। যদিও ইসরায়েল দাবি করেছে তারা হুমকি প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে, তবে এই হামলাটি তেল আবিবের প্রতিরক্ষা বলয়ের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছে।
'আঙুল এখন ট্রিগারে': হুথিদের হুঁশিয়ারি
হুথি সশস্ত্র বাহিনীর সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াহিয়া সারি টেলিগ্রামে এক ভিডিও বার্তায় এই অভিযানের দায় স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, লেবানন, ইরান, ইরাক এবং ফিলিস্তিনে মার্কিন-ইসরায়েলি "গণহত্যা ও আগ্রাসনের" পাল্টা জবাব হিসেবেই এই হামলা চালানো হয়েছে। ইয়াহিয়া সারি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁদের ‘আঙুল এখন ট্রিগারে’ রয়েছে। যদি লোহিত সাগরকে ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয় বা হামলার তীব্রতা বাড়ানো হয়, তবে ইয়েমেন আরও ভয়াবহ হামলা চালাতে দ্বিধা করবে না।
বাব আল-মানদেব ও বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন ঝুঁকি
বিশ্লেষকদের মতে, হুথিদের যুদ্ধে যোগ দেয়াটা কৌশলগতভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং বিপজ্জনক। হুথি তথ্য মন্ত্রণালয়ের আন্ডারসেক্রেটারি মোহাম্মদ মনসুর জানিয়েছেন, লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত এবং বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম লাইফলাইন ‘বাব আল-মানদেব’ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া এখন তাদের জন্য একটি বাস্তবসম্মত বিকল্প।
যদি হুথিরা এই পথ এবং সুয়েজ খাল অভিমুখে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়, তবে পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালীর পাশাপাশি বিশ্বের দুটি প্রধান বাণিজ্যিক পথ অবরুদ্ধ হয়ে পড়বে। এর ফলে বিশ্ব জ্বালানি বাজার এবং পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় এমন এক ধস নামবে যা কাটিয়ে ওঠা কয়েক দশকের ব্যাপার হতে পারে।
আরও পড়ুনঃ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি মিত্রদের জন্য ‘হরমুজ প্রণালি’ বন্ধ ঘোষণা করল ইরান
কেন এই হামলা যুদ্ধের সমীকরণ বদলে দিল?
আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা হুথিদের এই পদক্ষেপকে তিনটি প্রধান দিক থেকে দেখছেন:
১. বহুমুখী ফ্রন্ট (Multi-front War): ইসরায়েল এখন একই সঙ্গে হামাস (গাজা), হিজবুল্লাহ (লেবানন), ইরান এবং এখন ইয়েমেনের হুথিদের মোকাবিলা করছে। এই চতুর্মুখী আক্রমণ ইসরায়েলের সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে চরম পরীক্ষার মুখে ফেলেছে।
২. লোহিত সাগরের নিয়ন্ত্রণ: ইয়েমেনের ভৌগোলিক অবস্থান তাদের লোহিত সাগরের ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য দিয়েছে। হুথিরা যদি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা শুরু করে, তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন মার্কিন প্রশাসনের জন্য এটি হবে এক বিশাল চ্যালেঞ্জ।
৩. ইরানি অক্ষশক্তির সমন্বয়: হুথিরা নিজেদের ‘অক্ষশক্তি’ বা ‘অ্যাক্সিস অফ রেজিস্ট্যান্স’-এর অংশ মনে করে। তাদের এই অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, এই অঞ্চলের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এখন একটি কেন্দ্রীয় কমান্ডের অধীনে কাজ করছে।
ভবিষ্যৎ কোন দিকে?
২০২৪ সালে ট্রাম্প প্রশাসন হুথিদের ওপর কয়েক দফা বিমান হামলা চালিয়েছিল, কিন্তু এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। হুথিরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত ড্রোন এবং দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইলে সজ্জিত। ইসরায়েল যদি ইয়েমেনে পাল্টা বড় ধরনের হামলা চালায়, তবে এই সংঘাত পুরো লোহিত সাগর অঞ্চলকে গ্রাস করতে পারে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছে যে, হুথিদের এই ‘সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ’ মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রে দীর্ঘস্থায়ী কোনো পরিবর্তন নিয়ে আসে কি না।
সূত্র: বিবিসি, আল জাজিরা এবং সিএনএন।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন