বেনি জনসন পডকাস্টে ভ্যান্সের স্বীকারোক্তি
সম্প্রতি মার্কিন রক্ষণশীল পডকাস্টার বেনি জনসনকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে জেডি ভ্যান্স এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রদান করেন। ভ্যান্সের মতে, হোয়াইট হাউস এখন কেবল তাৎক্ষণিক বিজয় নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তার দিকে নজর দিচ্ছে। তিনি বলেন, “প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরও কিছু সময় ধরে এই যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চান। এর মূল উদ্দেশ্য হলো ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে এমন পর্যায়ে নামিয়ে আনা যাতে ভবিষ্যতে আর কখনো ইরানে হামলা চালানোর প্রয়োজন না হয়।”
জেডি ভ্যান্স আরও যোগ করেন, “ইরানের সরকারকে দীর্ঘ সময়ের জন্য দুর্বল করা আমাদের প্রধান লক্ষ্য এবং এটাই বর্তমান প্রশাসনের কৌশল।”
জ্বালানি তেলের দাম ও মার্কিন অর্থনীতি
সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স স্বীকার করেছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে, যার প্রভাব মার্কিন ও বিশ্ব অর্থনীতিতে পড়ছে। তবে তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, এটি সাময়িক। মার্কিন প্রশাসনের পরিকল্পনা অনুযায়ী লক্ষ্য অর্জিত হলে শিগগিরই জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমবে।
লক্ষ্য যখন 'রেজিম উইকেনিং' বা শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করা
বিশ্লেষকরা বলছেন, ভ্যান্সের এই মন্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, ট্রাম্প প্রশাসন কেবল ইরানের পরমাণু কর্মসূচি বা প্রক্সি নেটওয়ার্ক ধ্বংস করতে চায় না, বরং ইরানের অভ্যন্তরীণ কাঠামোকে নড়বড়ে করে দিতে চায়। যুদ্ধের সময়সীমা বাড়ানোর এই সিদ্ধান্ত মূলত ইরানকে একটি ‘ফেইলড স্টেট’ বা ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার কৌশল হতে পারে।
আরও পড়ুনঃ মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে যোগ দিল ইয়েমেনের হুথিরা: ইসরায়েলে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা!
ট্রাম্পের কৌশলের নেপথ্যে কী?
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা জেডি ভ্যান্সের এই বক্তব্যকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করছেন:
১. স্থায়ী নিরস্ত্রীকরণ: ট্রাম্প প্রশাসন মনে করছে, অর্ধেক কাজ সেরে ফিরে আসলে ইরান কয়েক বছরের মধ্যে আবার শক্তিশালী হয়ে উঠবে। তাই তারা ‘একবার এবং সবসময়ের জন্য’ ইরানকে নিষ্ক্রিয় করতে চায়।
২. ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ: ইরান দুর্বল হওয়া মানেই হিজবুল্লাহ, হামাস এবং হুথিদের মতো গোষ্ঠীগুলোর অর্থের উৎস বন্ধ হয়ে যাওয়া। এটি পরোক্ষভাবে ইসরায়েলের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে।
৩. অভ্যন্তরীণ রাজনীতি: ভ্যান্সের এই বক্তব্য রক্ষণশীল আমেরিকান ভোটারদের তুষ্ট করার একটি প্রয়াস হতে পারে, যারা মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকান আধিপত্য বজায় রাখতে আগ্রহী। তবে যুদ্ধের দীর্ঘসূত্রিতা ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে যদি তেলের দাম দ্রুত না কমে।
বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া ও উদ্বেগ
আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভ্যান্সের এই মন্তব্যে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে কাতার, ওমান এবং তুরস্কের মতো দেশগুলো মনে করছে, যুদ্ধের সময়সীমা বাড়লে পুরো অঞ্চল এক ভয়াবহ মানবিক সংকটের মুখে পড়বে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও যুদ্ধের দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছে, কারণ এতে শরণার্থী সংকট আরও প্রকট হতে পারে।
জেডি ভ্যান্সের এই সাক্ষাৎকারটি মূলত ট্রাম্প প্রশাসনের ‘পিস থ্রু স্ট্রেন্থ’ (শক্তির মাধ্যমে শান্তি) নীতিরই প্রতিফলন। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, ইরানকে দুর্বল করার এই প্রচেষ্টায় বিশ্বকে আর কত বড় চড়া মূল্য দিতে হবে? তেলের চড়া দাম এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা কতদিন সাধারণ মানুষকে সইতে হবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
সূত্র:আল-জাজিরা
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন