সত্যকথা ডেস্ক
বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের বাজারে গত কয়েকদিনের অস্থিরতা ও উদ্বেগ কাটিয়ে অবশেষে সব ধরনের বিধিনিষেধ তুলে নিয়েছে সরকার। রোববার (১৫ মার্চ) বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত রাজধানীর এক অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘোষণা দেন। মূলত আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতরে ঘরমুখো মানুষের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করা এবং বোরো মৌসুমের কৃষি সেচ কার্যক্রম সচল রাখতেই এই দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে। এর প্রভাবে দেশেও পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেলের মজুত নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে গত ৬ মার্চ থেকে সরকার জ্বালানি তেল বিক্রিতে নির্দিষ্ট সীমা বেঁধে দেয়। শুরুতে মোটরসাইকেলের জন্য মাত্র ২ লিটার এবং ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য ১০ লিটার তেলের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ১০ মার্চ রাইড শেয়ারিং সার্ভিসের কথা বিবেচনা করে মোটরসাইকেলের সীমা বাড়িয়ে ৫ লিটার করা হয়।
প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত আজ জানিয়েছেন, "জ্বালানি তেলের ওপর থেকে সব ধরনের বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করা হয়েছে। চট্টগ্রামে ইতোমধ্যে জ্বালানি তেলবাহী বেশ কয়েকটি জাহাজ পৌঁছেছে, যা আমাদের মজুত পরিস্থিতিকে শক্তিশালী করেছে। এখন আর গ্রাহকদের তেল কিনতে কোনো বাধার সম্মুখীন হতে হবে না।"
ঈদযাত্রায় বিশেষ প্রস্তুতি
ঈদের সময় লাখ লাখ মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে যান। এই বিশাল সংখ্যক মানুষের যাতায়াত সহজ করতে সরকার বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানিয়েছেন, ঘরমুখো মানুষের চাপ সামলাতে ঈদের আগের সাত দিন এবং পরের পাঁচ দিন মহাসড়কের পাশের সব ফিলিং স্টেশন ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকবে।
মন্ত্রী আরও স্পষ্ট করেন যে, তেলের সংকটের কোনো অজুহাত দেখিয়ে পরিবহন মালিকরা অগ্রিম টিকিট বাতিল করতে পারবেন না বা যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করতে পারবেন না। সরকার আশ্বস্ত করেছে যে, গণপরিবহনের জন্য পর্যাপ্ত তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে।
মাঠ পর্যায়ের চিত্র ও জনদুর্ভোগ
গত শনিবার পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন পাম্পে তেলের জন্য ছিল উপচে পড়া ভিড়। পরিবাগ, বিজয় সরণি ও শাহবাগ এলাকায় যানবাহনের দীর্ঘ সারি কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত ছাড়িয়ে গিয়েছিল। অনেক পাম্পে তেল ফুরিয়ে যাওয়ায় ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করে। শুধু ঢাকা নয়, খুলনা ও ফরিদপুর অঞ্চলেও সরবরাহ সংকটের কারণে পাম্প মালিকরা ডিস্ট্রিবিউটরদের কাছ থেকে তেল নেওয়া বন্ধ রেখেছিলেন। তবে আজ সরকারের এই নতুন ঘোষণার পর থেকে পাম্পগুলোতে শৃঙ্খলা ফিরতে শুরু করেছে।
মজুত পরিস্থিতি ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা
বর্তমানে দেশে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার টন ডিজেল এবং ৩২ হাজার টনের মতো অকটেন ও পেট্রোল মজুত রয়েছে, যা আগামী অন্তত ১৫ দিনের জন্য যথেষ্ট। এছাড়াও কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার শ্রীকাইল গ্যাসক্ষেত্রের নতুন কূপ (শ্রীকাইল-৫) থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ৮.১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হওয়া শুরু হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী অমিত বলেন, "আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা আমাদের বৈশ্বিক সংকটের মুখে ফেলছে। তবে আমরা ১৮০ দিনের একটি কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছি, যার লক্ষ্য হলো দেশীয় কূপ থেকে উৎপাদন বাড়িয়ে জাতীয় গ্রিডে আরও ৮২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত করা। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ জ্বালানি খাতে স্বনির্ভরতা অর্জন করবে।"
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যুদ্ধের খবরের পর মানুষের মধ্যে যে 'প্যানিক বায়িং' বা আতঙ্কিত হয়ে তেল মজুত করার প্রবণতা দেখা দিয়েছিল, সরকারের এই খোলাসা বক্তব্যের মাধ্যমে তা দূর হবে। বিশেষ করে কৃষিনির্ভর বাংলাদেশে সেচ মৌসুমে ডিজেলের অবাধ সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা ছিল। বর্তমান সিদ্ধান্তটি সেই আশঙ্কা অনেকাংশেই প্রশমিত করল।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন