সত্যকথা ডেস্ক
কূটনীতির আড়ালে চরম বিশ্বাসঘাতকতা: ইসমাইল বাঘায়ি
সাক্ষাৎকারে ইসমাইল বাঘায়ি মার্কিন কূটনীতির তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে বলেন, "যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের পূর্ব অভিজ্ঞতা অত্যন্ত ভয়াবহ ও বিপর্যয়কর। আমরা দেখেছি, গত ৯ মাসে যখনই পারমাণবিক ইস্যু বা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে আলোচনার টেবিলে বসা হয়েছে, ঠিক তখনই আমাদের ওপর বড় ধরনের হামলা চালানো হয়েছে।" তিনি আরও যোগ করেন, আলোচনায় বসার প্রস্তাব দিয়ে পেছন থেকে হামলা চালানো কূটনীতির নামে চরম বিশ্বাসঘাতকতা ছাড়া আর কিছুই নয়।
বাঘায়ি গত ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ অভিযানের কথা উল্লেখ করে বলেন, যেখানে বিপুল পরিমাণ প্রাণহানি এবং অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, সেখানে কোনো ধরনের আলোচনার প্রশ্নই আসে না।
ট্রাম্পের দাবি ও তেহরানের পাল্টা অবস্থান
উল্লেখ্য যে, গত কয়েকদিন ধরে ডোনাল্ড ট্রাম্প বিভিন্ন জনসভা ও সামাজিক মাধ্যমে দাবি করে আসছিলেন যে, ইরানের নীতিনির্ধারকদের সাথে তার প্রশাসনের ‘খুবই ভালো’ আলোচনা চলছে। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, ইরান অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা থেকে বাঁচতে একটি নতুন চুক্তিতে পৌঁছাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।
তবে তেহরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কাতার, ওমান বা পাকিস্তানের মতো কিছু বন্ধুপ্রতিম দেশ আলোচনার প্রস্তাব নিয়ে মধ্যস্থতা করতে চাইলেও ইরান তাতে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো সাড়া দেয়নি। বরং ট্রাম্পের এই দাবিকে বিশ্ব তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করার একটি ‘মনস্তাত্ত্বিক চাল’ (Psychological Warfare) হিসেবে দেখছে ইরান।
পূর্বশর্ত ছাড়া কোনো সমঝোতা নয়: গালিবফ
ইরানের সংসদ স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবফ এবং পররাষ্ট্র মুখপাত্র উভয়েই একটি বিষয়ে অনড়। তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, যতক্ষণ পর্যন্ত ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আগ্রাসন বন্ধ না হবে এবং ইরানের জ্বালানি ও সামরিক অবকাঠামোতে করা হামলার ক্ষতিপূরণ ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না মিলবে, ততক্ষণ কোনো ‘ডিল’ বা চুক্তির টেবিলে ইরান যাবে না। ইরানের নীতিনির্ধারকদের মতে, হামলা অব্যাহত রেখে আলোচনার আহ্বান জানানো মানে হলো ‘আত্মসমর্পণ’ করতে বলা, যা ইরান কখনোই করবে না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল। একদিকে ওমান, কাতার ও পাকিস্তানের মাধ্যমে পর্দার আড়ালে কিছু বার্তার আদান-প্রদান চললেও প্রকাশ্যে ইরান কোনো নমনীয়তা দেখাতে চাচ্ছে না। এর প্রধান কারণ হলো অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা। বিশেষ করে খামেনি-পরবর্তী নেতৃত্বের রূপরেখা নিয়ে যখন জল্পনা চলছে, তখন এই মুহূর্তে মার্কিনদের সাথে কোনো নমনীয় চুক্তি করাকে ইরানের কট্টরপন্থী গোষ্ঠী ‘বিজয়’ নয় বরং ‘পরাজয়’ হিসেবে দেখবে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন চায় ইরানের ওপর ‘সর্বোচ্চ চাপ’ (Maximum Pressure) প্রয়োগ করে তাদের একটি দুর্বল অবস্থানে নিয়ে আসতে। কিন্তু তেহরান পাল্টা কৌশল হিসেবে তাদের সামরিক শক্তি ও আঞ্চলিক মিত্রদের ব্যবহারের ওপর জোর দিচ্ছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে এই মুহূর্তে একটি বড় ধরনের সামরিক সংঘাত বা ছায়া যুদ্ধের (Proxy War) আশঙ্কা আরও তীব্র হচ্ছে।
পরিশেষে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এই বাগযুদ্ধ কেবল একটি আন্তর্জাতিক ইস্যু নয়, বরং এটি বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ট্রাম্পের দাবি বনাম তেহরানের প্রত্যাখ্যান—এই দুই মেরুর অবস্থানে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি এখন বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে। বিশ্ববাসী এখন তাকিয়ে আছে আগামী দিনগুলোতে এই দুই শক্তির পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয় তার ওপর।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন