ঘটনার সূত্রপাত ও প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা
প্রত্যক্ষদর্শী ও ঘাট সূত্রে জানা গেছে, বিকেল ৫টার কিছু পরে কুষ্টিয়া থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসটি ৩ নম্বর ঘাটে এসে পৌঁছায়। এ সময় একটি বড় ফেরি ঘাট ছেড়ে যাওয়ায় বাসটি পরবর্তী ফেরির জন্য পন্টুনে অপেক্ষা করছিল। সোয়া ৫টার দিকে ‘হাসনা হেনা’ নামক একটি ছোট ইউটিলিটি ফেরি সজোরে পন্টুনে আঘাত করলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাসটি সরাসরি পদ্মা নদীতে পড়ে যায়।
ঘাটের তত্ত্বাবধায়ক মো. মনির হোসেন বলেন, "সবকিছু চোখের সামনে ঘটে গেল। ফেরিটি পন্টুনে এত জোরে ধাক্কা দেয় যে বাসের চালক আর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেননি। মুহূর্তের মধ্যে বাসটি নদীতে তলিয়ে যায়। আমরা কিছুই করতে পারলাম না।"
উদ্ধার অভিযানে প্রতিবন্ধকতা ও স্বজনদের আহাহারি
দুর্ঘটনার প্রায় এক ঘণ্টা পর উদ্ধার অভিযান শুরু হওয়ায় ঘটনাস্থলে থাকা নিখোঁজদের স্বজনরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ডুবুরি দলের সদস্যরা জানিয়েছেন, বাসটি বর্তমানে ৩ নম্বর পন্টুনের ঠিক নিচে অবস্থান করছে। ফলে বাসের জানালা বা দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বিআইডব্লিউটিএ-এর উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’ ঘটনাস্থলে পৌঁছে বাসটি টেনে তোলার চেষ্টা চালাচ্ছে।
রাজবাড়ী ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী পরিচালক দেওয়ান সোহেল রানা জানান, "পন্টুনের নিচে বাসটি চলে যাওয়ায় আমাদের কাজ করতে সমস্যা হচ্ছে। ঢাকা এবং ফরিদপুর থেকে আরও বিশেষজ্ঞ ডুবুরি দল ঘটনাস্থলে আসছে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছি।"
বেঁচে ফেরা যাত্রীদের আকুতি
বাসে থাকা আব্দুল আজিজুল নামে এক যাত্রী কোনোমতে সাঁতরে উপরে উঠতে পারলেও তার স্ত্রী ও শিশু সন্তান নিখোঁজ রয়েছেন। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, "আমি কোনোভাবে বের হতে পারলেও আমার পরিবারের সদস্যরা ভেতরে আটকে আছে। উদ্ধার কাজ এত দেরিতে শুরু হলো কেন?" স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৪০ জন যাত্রীর মধ্যে মাত্র ১১ জন সাঁতরে পাড়ে উঠতে পেরেছেন। বাকিদের ভাগ্য এখনো অনিশ্চিত।
কেন বারবার এই দুর্ঘটনা?
দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে এই ধরনের দুর্ঘটনা নতুন নয়। বিশেষজ্ঞরা এই দুর্ঘটনার পেছনে তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন:
১. পন্টুনের অব্যবস্থাপনা: পন্টুনে ফেরি ভিড়ানোর সময় চালকদের অসতর্কতা এবং সজোরে ধাক্কা দেওয়া অন্যতম কারণ।
২. নিরাপত্তা বেষ্টনীর অভাব: পন্টুনের চারদিকে শক্তিশালী কোনো রেলিং বা নিরাপত্তা বেষ্টনী নেই যা চলন্ত বা অপেক্ষমাণ যানবাহনকে নদীতে পড়া থেকে রক্ষা করতে পারে।
৩. উদ্ধার সরঞ্জামের অভাব: দৌলতদিয়া ঘাটের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিজস্ব কোনো শক্তিশালী উদ্ধারকারী জাহাজ বা স্থায়ী ডুবুরি দল না থাকায় ঢাকা বা আরিচা থেকে সাহায্যের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। এই এক ঘণ্টার বিলম্বই অনেক ক্ষেত্রে প্রাণহানির প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
পদ্মার তীব্র স্রোত আর পন্টুনের জটিল অবস্থান উদ্ধার অভিযানকে আরও কঠিন করে তুলেছে। জেলা প্রশাসক সুলতানা আক্তার জানিয়েছেন, উদ্ধার কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ফায়ার সার্ভিস ও বিআইডব্লিউটিএ কাজ চালিয়ে যাবে। তবে প্রশাসনের উচিত দ্রুত এই রুটে স্থায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, যাতে আর কোনো প্রাণ এভাবে অকালে ঝরে না যায়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন