বাংলা শিশুসাহিত্যের প্রবাদপ্রতিম পুরুষ ও একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রখ্যাত ছড়াকার সুকুমার বড়ুয়া পরলোকগমন করেছেন। শুক্রবার সকাল ৬টা ৫৫ মিনিটের দিকে চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার গহিরায় জে কে মেমোরিয়াল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর। তিনি স্ত্রী, তিন মেয়ে ও এক ছেলেসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তার মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে দেশের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে আসে।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ছন্দের জাদুকর সুকুমার বড়ুয়া দীর্ঘকাল ধরে বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। ২০০৬ সালে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের পর থেকে তার শরীরের একাংশ অবশ হয়ে যায়। এরপর থেকে তিনি হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের সমস্যায় জর্জরিত ছিলেন। গত এক সপ্তাহ ধরে তিনি চট্টগ্রামের একটি মেডিকেল সেন্টারে চিকিৎসাধীন ছিলেন। অবস্থার অবনতি হলে তাকে জে কে মেমোরিয়াল হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। তার ফুসফুসে পানি জমে শ্বাসকষ্ট প্রবল আকার ধারণ করেছিল। চিকিৎসকরা আপ্রাণ চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত তাকে ফেরানো সম্ভব হয়নি।
১৯৩৮ সালের ৫ জানুয়ারি চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার মধ্যম বিনাজুরি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এই গুণী সাহিত্যিক। তার জীবন ছিল অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় ও সংগ্রামের। মাত্র তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করলেও নিজ মেধা ও সাধনায় তিনি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছড়াকারের আসনে অধিষ্ঠিত হন। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি মেসে বাবুর্চির কাজও করেছেন। পরবর্তীতে ১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে যোগদান করেন এবং ১৯৯৯ সালে স্টোর কিপার হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।
প্রায় ছয় দশকের দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে সুকুমার বড়ুয়া ছড়াকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তার লেখনীতে হাস্যরস ও ব্যঙ্গের মোড়কে উঠে আসত গভীর জীবনদর্শন, নৈতিক শিক্ষা, দেশপ্রেম এবং রাজনৈতিক সচেতনতা। পাগলা ঘোড়া, ভিজে বেড়াল, চন্দনা রঞ্জনার ছড়া, এলোপাতাড়ি, চিচিং ফাঁক ও জীবনের ভেতরে বাইরে-এর মতো তার অসংখ্য কালজয়ী গ্রন্থ নতুন প্রজন্মের পাঠকদের কাছে দারুণ সমাদৃত। তার সহজ-সরল উপস্থাপনা ও ছন্দবদ্ধ লেখনীর কারণে তাকে ছড়াসম্রাট ও ছড়ারাজ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাকে ২০১৭ সালে একুশে পদকে ভূষিত করে। এছাড়াও তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, আলাওল সাহিত্য পুরস্কার ও চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব সম্মাননাসহ দেশ-বিদেশের অসংখ্য পদক লাভ করেছেন। তার প্রয়াণে বাংলা ছড়া সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র নিভে গেল।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন