রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের চত্বর মঙ্গলবার এক বিষণ্ন শোকের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। হাসপাতাল থেকে প্রেস ব্রিফিং করে জানানো হয় যে তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আর নেই। গত ২৩ নভেম্বর থেকে চিকিৎসাধীন থাকার পর তার এই প্রয়াণে গোটা জাতি শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ে। খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই হাসপাতালের বাইরে ভিড় জমান হাজারো সমর্থক ও সাধারণ মানুষ। চোখের পানি আর মৌন প্রার্থনায় তারা তাদের প্রিয় নেত্রীকে বিদায় জানান। বুধবার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে তার জানাজায় লাখো মানুষের ঢল নামে, যেখানে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস থেকে শুরু করে বিদেশি কূটনীতিক ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা অংশ নেন।
খালেদা জিয়ার এই প্রয়াণ বাংলাদেশের রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে ঘটল। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের তারিখ নির্ধারিত রয়েছে। বছরের পর বছর অসুস্থতা ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি ছিলেন দলের ঐক্যের প্রতীক। তার অনুপস্থিতিতে বিএনপি এখন আনুষ্ঠানিকভাবে ‘খালেদা জিয়া-উত্তর’ যুগে প্রবেশ করল। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান এবং পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ হওয়ার পর এখন সব ক্ষমতা ও জবাবদিহির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন তার ছেলে ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দীর্ঘ ১৭ বছরের প্রবাস জীবন কাটিয়ে সম্প্রতি ২৫ ডিসেম্বর তিনি দেশে ফিরেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত কারিশমা দলটিকে উজ্জীবিত রাখতে যে ভূমিকা পালন করত, এখন সেই শূন্যস্থান পূরণ করা তারেক রহমানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। লেখক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, খালেদা জিয়া নিজেও আশির দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে নিজেকে প্রমাণ করেছিলেন। এখন সামনের নির্বাচন তারেক রহমানের নেতৃত্বকে বৈধতা দেওয়ার ক্ষেত্রে ভাগ্যনির্ধারক হয়ে দাঁড়াতে পারে। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী অবশ্য মনে করেন, তারেক রহমানের নেতৃত্ব ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত এবং তিনি কার্যকরভাবে দল পরিচালনা করতে সক্ষম।
বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণটিও আগের তুলনায় জটিল। তিন দশকের বেশি সময় ধরে চলা আওয়ামী লীগ-বিএনপি দ্বিমুখী লড়াইয়ের বদলে এখন বিএনপিকে লড়তে হচ্ছে জামায়াতে ইসলামী ও জুলাই আন্দোলনের নেতাদের গঠিত নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলোর জোটের সঙ্গে। বিশ্লেষক দিলারা চৌধুরী মনে করেন, খালেদা জিয়া কেবল দলের জন্য নন, বরং দেশের জন্য একজন অভিভাবক ছিলেন। তার অনুপস্থিতিতে তারেক রহমানকে এখন বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ও সংস্কার কর্মসূচির মাধ্যমে জনসমর্থন ধরে রাখতে হবে। তৃণমূলের কর্মীরাও মনে করেন, জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখা হবে আগামীর মূল পরীক্ষা। উত্তরাধিকারের বাইরেও জনগণের রায়ের ওপরই নির্ভর করবে বিএনপির আগামীর পথচলা।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন