বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। বুধবার বিকেল পৌনে ৫টার দিকে রাজধানীর চন্দ্রিমা উদ্যান এলাকায় জিয়া উদ্যানে স্বামী সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সমাধির পাশেই তাকে দাফন করা হয়। শেষ বিদায়ের এই ক্ষণে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয় যা দলীয় গণ্ডি পেরিয়ে পুরো দেশে এক শোকের ছায়া ফেলে। বিকেল ৩টার পর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় তার বিশাল জানাজা নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে সংসদ ভবন এলাকা থেকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে জাতীয় পতাকায় মোড়ানো কফিনবাহী গাড়িতে করে মরদেহ জিয়া উদ্যানে নিয়ে আসা হয়। সমাধিস্থলের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর তিন বাহিনীর সদস্যরা অর্থাৎ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর সদস্যরা অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর মরদেহ কাঁধে তুলে নেন। রাষ্ট্রীয় নীতি অনুযায়ী সশস্ত্র সালাম ও রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শনের পর তাকে সমাহিত করা হয়। দাফন শেষে কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানান স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা, আইন উপদেষ্টা, তিন বাহিনীর প্রধান এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

খালেদা জিয়ার জানাজা নামাজে ইমামতি করেন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি মো. আব্দুল মালেক। জানাজা শুরুর ঠিক আগে উপস্থিত হাজার হাজার মানুষের উদ্দেশে সংক্ষিপ্ত কথা বলেন তারেক রহমান। তিনি অত্যন্ত ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলেন যে আপনারা আমার মায়ের জন্য দোয়া করবেন। আল্লাহ যেন তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করেন। তার এই সংক্ষিপ্ত বক্তব্য উপস্থিত সবার মাঝে এক আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। জানাজায় অংশ নেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তার পাশাপাশি সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে জানাজায় অংশ নেন তিন বাহিনীর প্রধানসহ সরকারের উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা। এই জানাজা অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক মতাদর্শের ঊর্ধ্বে উঠে বিভিন্ন স্তরের মানুষ অংশগ্রহণ করেন যা দেশের সাম্প্রতিক সম্প্রীতির রাজনীতির এক নতুন উদাহরণ তৈরি করে।
বুধবারের এই দিনটি শুরু হয়েছিল গভীর শোক আর প্রতীক্ষার মধ্য দিয়ে। সকাল ৯টা ১৭ মিনিটে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স রওনা হয় গুলশান অ্যাভিনিউয়ের ১৯৬ নম্বর বাসার উদ্দেশ্যে। এটি ছিল তারেক রহমানের অস্থায়ী বাসভবন যেখানে খালেদা জিয়ার মরদেহ পৌঁছালে এক শোকাতুর পরিবেশ তৈরি হয়। দলের নেতাকর্মীরা প্রিয় নেত্রীকে শেষবারের মতো দেখতে সেখানে ভিড় জমান। সকাল ১১টার দিকে সেখান থেকে সংসদ ভবনের উদ্দেশ্যে মরদেহ নিয়ে যাত্রা শুরু হয়। দুপুর ১২টার একটু পর কফিনবাহী গাড়িটি যখন জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় পৌঁছায় তখন পুরো এলাকা লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, বিজয় সরণি, খামার বাড়ি, কারওয়ান বাজার এবং ফার্মগেট এলাকা থেকে শুরু করে শাহবাগ পর্যন্ত মানুষের ভিড় ছড়িয়ে পড়ে। রাজধানী ঢাকার প্রতিটি মোড় যেন মিছিলে মিছিলে একাকার হয়ে যায়। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিএনপির তৃণমূলের কর্মীরা তাদের প্রিয় নেত্রীর শেষ যাত্রায় শামিল হতে গভীর রাত থেকেই অবস্থান নিয়েছিলেন।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও গভীর শোকের ছায়া দেখা যায়। তার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে এবং পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানাতে ঢাকা আসেন ভারত, পাকিস্তানসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বুধবার দুপুরে জাতীয় সংসদ ভবনে তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করেন এবং ভারতের সরকারের পক্ষ থেকে শোকবার্তা হস্তান্তর করেন। বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয় যে প্রতিবেশী দেশ ভারত খালেদা জিয়ার ইন্তেকালে গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে সমবেদনা প্রকাশ করেছে। একইভাবে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিক তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করে ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয়ভাবে শোক প্রকাশ করেন। বিদেশি কূটনীতিকদের এই উপস্থিতি প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে খালেদা জিয়ার গুরুত্ব কতটুকু ছিল।
নিরাপত্তার খাতিরে আজ রাজধানীজুড়ে ছিল কঠোর ব্যবস্থা। বিজিবির সদর দপ্তর থেকে জানানো হয় যে মঙ্গলবার রাত থেকেই রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতাল, সংসদ ভবন ও জিয়া উদ্যান এলাকায় ২৭ প্লাটুন বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়। এর পাশাপাশি সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং র্যাব সদস্যরা প্রতিটি পয়েন্টে অবস্থান নিয়েছিলেন যেন কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি না হয়। সাধারণ ছুটির কারণে রাস্তাঘাটে যানবাহন কম থাকলেও মানুষের পদচারণা ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে সংসদ ভবনের চারপাশের প্রতিটি প্রবেশপথে তল্লাশি চৌকি বসানো হয়। জানাজা ও দাফন চলাকালীন আকাশপথেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি লক্ষ্য করা গেছে।
বেগম খালেদা জিয়ার জীবনের শেষ কয়েকটা বছর কেটেছে অত্যন্ত প্রতিকূলতার মধ্যে। গত মঙ্গলবার ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার চিকিৎসকরা জানিয়েছেন যে দীর্ঘ এক মাসেরও বেশি সময় তিনি হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিটে অর্থাৎ সিসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তার এই প্রস্থান ছিল মূলত দীর্ঘদিনের অসুস্থতার করুণ পরিণতি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নির্বাহী আদেশে তিনি কারামুক্ত হন। এরপর উন্নত চিকিৎসার জন্য গত ৭ জানুয়ারি তাকে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে নেওয়া হয়েছিল। সেখানে ১১৭ দিন অবস্থান করে চিকিৎসা শেষে গত ৬ মে তিনি দেশে ফিরে আসেন। দেশে ফেরার পর থেকেই তিনি বারবার শারীরিক জটিলতায় আক্রান্ত হন। কখনো লিভার সিরোসিস, কখনো আর্থ্রাইটিস আবার কখনো কিডনি ও ফুসফুসের সংক্রমণ তাকে বারবার হাসপাতালের বিছানায় নিয়ে গেছে। জীবনের শেষ সময়ে তার স্থায়ী ঠিকানা যেন হাসপাতালই হয়ে উঠেছিল।
গত ২১ নভেম্বর সশস্ত্র বাহিনী দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাওয়ার সময় তিনি কিছুটা অসুস্থ বোধ করেছিলেন। এরপর ২৩ নভেম্বর শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়ায় তাকে জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেই থেকেই তিনি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে ছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে তিনি দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করেন। তার এই মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বিশাল শূন্যতা তৈরি করেছে। তিনবারের সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বহু চড়াই-উতরাই পার করেছেন। স্বামীর মৃত্যুর পর দলের হাল ধরা থেকে শুরু করে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য।
সরকার খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের লক্ষ্যে বুধবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত অর্থাৎ ৩১ ডিসেম্বর থেকে ২ জানুয়ারি পর্যন্ত তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে। এই দিনগুলোতে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে। এ ছাড়া বুধবার সারাদেশে সাধারণ ছুটি পালিত হয়েছে যাতে মানুষ নির্বিঘ্নে জানাজায় অংশ নিতে পারে। জানাজা ও দাফন শেষে সন্ধ্যায় জিয়া উদ্যানে মোনাজাত করা হয়। মোনাজাতে দেশের শান্তি, সমৃদ্ধি এবং মরহুমার আত্মার মাগফিরাত কামনা করা হয়। রাত বাড়ার সাথে সাথে জিয়া উদ্যান এলাকা থেকে মানুষ ধীরে ধীরে চলে যেতে শুরু করলেও সেখানে এক গুমোট শোক বিরাজ করছে। নেতাকর্মীরা তাদের স্মৃতিচারণে বারবার ফিরে আসছিলেন খালেদা জিয়ার আপসহীন নেতৃত্বের দিনগুলোতে।
খালেদা জিয়ার মৃত্যু পরবর্তী সময়ে বিএনপির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব এবং দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট কোন দিকে মোড় নেবে তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে আজকের দিনটি ছিল কেবলই শোকের এবং শ্রদ্ধার। তারেক রহমান যেভাবে মায়ের কফিনের পাশে বসে কোরআন তিলাওয়াত করেছেন এবং দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন তা সাধারণ মানুষের মনে গভীরভাবে দাগ কেটেছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার যে অবদান তা আগামী প্রজন্ম স্মরণ রাখবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা থেকে জিয়া উদ্যান পর্যন্ত যে জনসমুদ্র দেখা গেছে তা তার জনপ্রিয়তারই প্রমাণ দেয়। রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও গণমানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে বেগম খালেদা জিয়া এখন তার চিরস্থায়ী ঠিকানায় শায়িত। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষগুলো অশ্রুসজল চোখে তাদের প্রিয় নেত্রীকে বিদায় জানিয়ে নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরে যেতে শুরু করেছেন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন