বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় ও বর্ণাঢ্য অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। মঙ্গলবার ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। তিনি দীর্ঘদিন ধরে লিভার সিরোসিস, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও কিডনি জটিলতাসহ নানাবিধ বার্ধক্যজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন।
বেগম জিয়ার মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে রাজনৈতিক অঙ্গনসহ পুরো দেশে শোকের ছায়া নেমে আসে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ ও তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তাঁর প্রয়াণে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি বেগম জিয়াকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের এক মহান অভিভাবক হিসেবে অভিহিত করেছেন। সরকারের পক্ষ থেকে আগামীকাল বুধবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে এবং বুধবার সারাদেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
বিশ্বনেতাদের মধ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ এবং চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়ান শোকবার্তা পাঠিয়েছেন। মোদি তাঁর বার্তায় খালেদা জিয়াকে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক জোরদারের অন্যতম কারিগর হিসেবে উল্লেখ করেন। এমনকি তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী শেখ হাসিনাও ভারত থেকে পাঠানো এক বার্তায় দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রীর অবদানকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেছেন।
১৯৪৫ সালে দিনাজপুরে জন্মগ্রহণ করা খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৮১ সালে স্বামী রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর। ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি দলের প্রাথমিক সদস্যপদ গ্রহণের মাধ্যমে তিনি রাজনীতিতে আসেন। ১৯৮৪ সালে বিএনপির হাল ধরার পর তিনি দীর্ঘ ৪১ বছর দলটির নেতৃত্ব দেন। তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বিএনপি ১৯৯১, ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হয়। ১৯৯১ সালে তিনি বাংলাদেশের প্রথম এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নির্বাচিত নারী সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে ইতিহাস গড়েন। রাজনৈতিক জীবনে তাঁর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো, তিনি অংশগ্রহণ করা প্রতিটি সংসদীয় আসনে জয়ী হয়েছেন এবং কখনো কোনো নির্বাচনে পরাজিত হননি।
নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়নে তাঁর যুগান্তকারী ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৫ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিনের করা বিশ্বের ক্ষমতাধর নারীদের তালিকায় তিনি ২৯তম অবস্থানে ছিলেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বহু জেল-জুলুম ও নির্যাতন সহ্য করেও তিনি আপসহীন ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি কারামুক্তি পান এবং চিকিৎসার জন্য লন্ডন ঘুরে সম্প্রতি দেশে ফেরেন।
আগামীকাল বুধবার দুপুরে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হবে এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হবে। তাঁর এই চিরবিদায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতির এক মহাকাব্যিক অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন