আন্তর্জাতিক ডেস্ক | বিডি নিউজ সত্যকথা
![]() |
| ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্ভাব্য এক পৃষ্ঠার যুদ্ধবিরতি চুক্তির কৌশলগত বিশ্লেষণ। (প্রতীকী ছবি) |
এক পৃষ্ঠার চুক্তিতে যা থাকছে
হোয়াইট হাউসের সূত্র এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অবগত কর্মকর্তাদের মতে, এই সম্ভাব্য চুক্তিটি হবে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত কিন্তু কৌশলগতভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী। প্রস্তাবিত খসড়া অনুযায়ী, ইরান সাময়িকভাবে তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম বন্ধ রাখতে রাজি হতে পারে। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর আরোপিত কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাগুলো ধাপে ধাপে শিথিল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এর মাধ্যমে বিদেশের বিভিন্ন ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানের বিপুল পরিমাণ অর্থ ছাড়ের পথ প্রশস্ত হতে পারে। পাশাপাশি, বিশ্ব অর্থনীতির ধমনী হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার বিষয়েও দুই পক্ষ একমত হতে পারে বলে জানা গেছে।
ট্রাম্পের ‘এপিক ফিউরি’ এবং কঠোর হুঁশিয়ারি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ এক পোস্টে এই আলোচনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে তার চিরচেনা আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতেই তিনি ইরানকে সতর্ক করে দিয়েছেন। ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরান যদি প্রস্তাবিত শর্তগুলো মেনে চলে, তবেই কেবল চলমান সামরিক অভিযান ‘এপিক ফিউরি’ (Epic Fury) বন্ধ করা হবে এবং কার্যকর অবরোধ তুলে নেওয়া হবে।
ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় বলেন, "যদি তারা (ইরান) রাজি না হয়, তবে পুনরায় বোমাবর্ষণ শুরু হবে এবং তা আগের চেয়ে অনেক বেশি মাত্রা ও তীব্রতায় হবে।" মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই মন্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, ওয়াশিংটন আলোচনার টেবিলে নমনীয় হলেও সামরিক শক্তির হুঙ্কার ছাড়তে পিছপা হচ্ছে না।
৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম ও পরবর্তী পদক্ষেপ
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই তেহরানের অবস্থান জানতে চায় ওয়াশিংটন। যদিও এখনো কোনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি, তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, সংঘাত শুরুর পর এই প্রথম দুই পক্ষ এতটা কাছাকাছি এসেছে।
খসড়ায় ১৪ দফা প্রস্তাবনা নিয়ে বর্তমানে পর্দার আড়ালে দর-কষাকষি চলছে। জানা গেছে, প্রথমে একটি আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হবে। এরপর শুরু হবে ৩০ দিনের নিবিড় ও গভীর আলোচনা। এই সময়ের মধ্যে পারমাণবিক কার্যক্রমের সীমা নির্ধারণ, স্থায়ীভাবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং সমুদ্রপথ পুরোপুরি উন্মুক্ত করার বিষয়ে একটি চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরির চেষ্টা করা হবে। এই আলোচনার সম্ভাব্য স্থান হিসেবে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ বা সুইজারল্যান্ডের জেনেভার নাম উঠে এসেছে।
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে জটিলতা
আলোচনার টেবিলে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ রাখার সময়সীমা। যুক্তরাষ্ট্র চায় দীর্ঘমেয়াদি (অন্তত এক দশক) বিধিনিষেধ, যেখানে ইরান তুলনামূলক স্বল্পমেয়াদি সময়সীমা চাইছে। এছাড়া উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ইরানের বাইরে সরিয়ে নেওয়া এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের জন্য পরমাণু স্থাপনাগুলো উন্মুক্ত রাখার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতি
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই প্রক্রিয়া নিয়ে কিছুটা সাবধানী অবস্থান নিয়েছেন। তিনি এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে, এই ধরনের জটিল চুক্তিতে তাড়াহুড়ো করার প্রয়োজন নেই। রুবিও ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের একাংশকে ‘উন্মাদ’ আখ্যা দিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন যে, তারা শেষ পর্যন্ত কোনো ফলপ্রসূ চুক্তিতে পৌঁছাতে ইচ্ছুক কি না।
অন্যদিকে, হোয়াইট হাউসের আশঙ্কা হলো, ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কট্টরপন্থী ও সংস্কারপন্থীদের মধ্যে যে বিভক্তি রয়েছে, তা এই শান্তি প্রক্রিয়াকে ভেস্তে দিতে পারে। এর আগেও একাধিকবার আলোচনা অনেক দূর এগিয়েও শেষ মুহূর্তে বাতিল হয়ে গিয়েছিল।
বিডি নিউজ সত্যকথা বিশ্লেষণ
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই সম্ভাব্য সমঝোতা স্মারককে বিশ্ব রাজনীতির দাবার ছকে এক বিশাল চাল হিসেবে দেখছে বিডি নিউজ সত্যকথা। আমাদের বিশ্লেষণে এই পরিস্থিতির তিনটি প্রধান দিক উঠে এসেছে:
১. অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতা: ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে সরাসরি যুদ্ধের চেয়ে অর্থনৈতিক অবরোধের মাধ্যমে জয়ী হওয়াকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। অন্যদিকে, দীর্ঘদিনের অবরোধে ইরানের অর্থনীতি পঙ্গুপ্রায়। ফলে দুই পক্ষের জন্যই এই মুহূর্তে যুদ্ধবিরতি একটি 'উইন-উইন' পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
২. হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব: বিশ্ব জ্বালানি তেলের একটি বড় অংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে, যা ট্রাম্পের ঘরোয়া অর্থনীতির জন্য হুমকি। তাই এই পথ উন্মুক্ত রাখাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য।
৩. বিশ্বস্ততার সংকট: এই চুক্তির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দুই দেশের মধ্যে চরম আস্থাহীনতা। ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তি থেকে ট্রাম্পের একতরফা সরে আসা ইরান এখনো ভোলেনি। অন্যদিকে, ইরানের পরমাণু অস্ত্র তৈরির উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সবসময়ই শঙ্কিত। বিডি নিউজ সত্যকথা মনে করে, এক পৃষ্ঠার এই সমঝোতা কেবল একটি ‘সাময়িক স্বস্তি’ হতে পারে, তবে স্থায়ী শান্তির জন্য প্রয়োজন আরও দীর্ঘমেয়াদি এবং স্বচ্ছ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা। যদি ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ইতিবাচক সাড়া না আসে, তবে মধ্যপ্রাচ্য এক ভয়ংকর যুদ্ধের মুখে পড়তে পারে।
আরও পড়ুন: আইসিসি র্যাঙ্কিংয়ে শ্রীলঙ্কাকে টপকে আটে বাংলাদেশ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন