আন্তর্জাতিক ডেস্ক | বিডি নিউজ সত্যকথা
![]() |
| শান্তি আলোচনায় ইরানের প্রস্তুতি এবং আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার ওপর একটি বিশেষ ইনফোগ্রাফিক। |
ম্যাক্রোঁর সঙ্গে ফোনালাপ: আলোচনার মূল সুর
বুধবার (৬ মে) ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর সঙ্গে এক দীর্ঘ ফোনালাপে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান তার দেশের এই অবস্থানের কথা তুলে ধরেন। চীনা সংবাদমাধ্যম সিনহুয়া এবং গালফ নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফোনালাপে পেজেশকিয়ান যুদ্ধের ভয়াবহতা এড়াতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন।
তিনি মাখোঁকে জানান, ইরান কখনোই যুদ্ধ চায় না, তবে আক্রান্ত হলে আত্মরক্ষার অধিকার তারা রাখে। ফরাসি প্রেসিডেন্টও এ সময় মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা প্রশমনে ইরানের ইতিবাচক ভূমিকার প্রত্যাশা করেন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইউরোপীয় দেশগুলোর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি মধ্যস্থতার পথ খুঁজছে তেহরান।
‘পেছন থেকে ছুরি মারা’: যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তীব্র ক্ষোভ
আলোচনার প্রস্তাব দিলেও ওয়াশিংটনের প্রতি নিজের গভীর অবিশ্বাসের কথা লুকিয়ে রাখেননি পেজেশকিয়ান। তিনি অভিযোগ করেন, যখনই কোনো দ্বিপক্ষীয় সংলাপ বা আলোচনার পথ তৈরি হয়, তখনই যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে লক্ষ্য করে সামরিক উস্কানি দেয়।
প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান ফোনালাপে অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, সাম্প্রতিক আলোচনার প্রক্রিয়া চলমান থাকা অবস্থাতেই ওয়াশিংটন ইরানের ওপর অন্তত দুবার সামরিক হামলা চালিয়েছে। তিনি এই আচরণকে ‘পেছন থেকে ছুরি মারা’র সঙ্গে তুলনা করে বলেন, "আলোচনার টেবিলে বসে আক্রমণ চালানো কোনো সভ্য দেশের কাজ হতে পারে না। এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রশাসনের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।"
এক পৃষ্ঠার সমঝোতা স্মারক: কী আছে সেই খসড়ায়?
কূটনৈতিক এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, যুদ্ধ বন্ধ এবং বড় ধরনের সংঘাত এড়াতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান মাত্র এক পৃষ্ঠার একটি সংক্ষিপ্ত সমঝোতা স্মারক (MoU) চূড়ান্ত করার খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে।
এই সম্ভাব্য চুক্তির তিনটি প্রধান শর্ত সামনে এসেছে:
১. ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত: ইরান সাময়িকভাবে তাদের উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি বন্ধ রাখবে।
২. নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার: এর বিনিময়ে ওয়াশিংটন তেহরানের ওপর আরোপিত কিছু কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে, যা ইরানের ঝিমিয়ে পড়া অর্থনীতিতে প্রাণ সঞ্চার করতে পারে।
৩. হরমুজ প্রণালি উন্মুক্তকরণ: বিশ্ব তেলের বাজারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রুট ‘হরমুজ প্রণালি’তে সব ধরনের জাহাজ চলাচলের বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করবে উভয় পক্ষ।
ইসরায়েল ইস্যু ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা
যদিও এই সমঝোতা মূলত ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে, তবে এর বড় একটি অংশ জুড়ে রয়েছে ইসরায়েল। ইরান চায় ইসরায়েলের সামরিক আগ্রাসন বন্ধ হোক, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান যেন তার মিত্রদের (প্রক্সি গোষ্ঠী) মাধ্যমে ইসরায়েলের ওপর হামলা না চালায়। পেজেশকিয়ান মাখোঁকে জানিয়েছেন, যদি পশ্চিমারা ইসরায়েলকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তবে এই অঞ্চলে শান্তি ফেরানো অনেক সহজ হবে।
বিশ্ব বাজারের প্রতিক্রিয়া
দুই দেশের মধ্যে এই সম্ভাব্য চুক্তির খবরে বিশ্ববাজারে তেলের দামে ইতিবাচক প্রভাব দেখা গেছে। হরমুজ প্রণালি নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটলে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক হবে—এমন আশায় বিনিয়োগকারীরা কিছুটা স্বস্তি বোধ করছেন। তবে চুক্তির স্থায়িত্ব নিয়ে এখনো বড় ধরনের অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
বিডি নিউজ সত্যকথা বিশ্লেষণ
ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের এই বক্তব্যকে বিডি নিউজ সত্যকথা একটি দ্বিমুখী কৌশল হিসেবে দেখছে:
১. কূটনৈতিক রক্ষাকবচ: পেজেশকিয়ান নিজেকে একজন উদারপন্থী ও শান্তিকামী নেতা হিসেবে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরতে চাইছেন। মাখোঁর মতো নেতাদের সঙ্গে কথা বলে তিনি প্রমাণ করতে চান যে, ইরান সংঘাত নয় বরং সম্মানজনক সমঝোতা চায়। এটি ইরানের ওপর থেকে পশ্চিমা চাপ কমানোর একটি মোক্ষম চাল।
২. অবিশ্বাসের দেয়াল: 'পেছন থেকে ছুরি মারা'র যে অভিযোগ তিনি করেছেন, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি মূলত ইরানের কট্টরপন্থীদের শান্ত করার একটি চেষ্টা। পেজেশকিয়ান বোঝাতে চাইছেন যে, তিনি আলোচনার টেবিলে থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চোখ বুজে ভরসা করছেন না।
৩. অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের মরিয়া চেষ্টা: এক পৃষ্ঠার চুক্তিতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টিই ইরানের মূল লক্ষ্য। মুদ্রাস্ফীতি এবং অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ সামলাতে ইরানের এই মুহূর্তে কিছু অর্থনৈতিক স্বস্তি প্রয়োজন। অন্যদিকে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনও হয়তো দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ব্যয় এড়াতে এই ‘সংক্ষিপ্ত সমঝোতা’কে বেছে নিতে পারে। তবে ইতিহাস বলে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের যে কোনো চুক্তিই বরফ গলানোর চেয়ে বেশি সময় ধরে টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
আরও পড়ুন: ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি: এক পৃষ্ঠার চুক্তিতেই কি থামছে সংঘাত?
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন