আন্তর্জাতিক ডেস্ক | বিডি নিউজ সত্যকথা
![]() |
হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে ইরানের শক্তিশালী ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা। (সূত্র: প্রেস টিভি) |
সংঘাতের সূত্রপাত: অভিযোগ বনাম পাল্টা অভিযোগ
ঘটনার সূত্রপাত হয় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায়। আইআরজিসি নৌবাহিনীর বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, মার্কিন সামরিক বাহিনী দুটি বড় ধরনের ‘উসকানিমূলক’ কাজ করেছে। প্রথমত, মার্কিন বাহিনী চলমান যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে জাস্ক বন্দরের কাছে একটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালায়। দ্বিতীয়ত, তেহরানের পক্ষ থেকে বারবার সতর্কবার্তা দেওয়া সত্ত্বেও মার্কিন নৌবাহিনীর তিনটি গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার হরমুজ প্রণালির দিকে অগ্রসর হতে থাকে।
আইআরজিসি নৌবাহিনীর কমান্ডারের ভাষ্য অনুযায়ী, “শত্রুপক্ষ আমাদের জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং আন্তর্জাতিক জলসীমার নিয়ম ভঙ্গ করে অগ্রসর হচ্ছিল। আমাদের তেলবাহী জাহাজে হামলা চালিয়ে তারা যুদ্ধবিরতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় আমরা আমাদের সীমানা রক্ষায় চূড়ান্ত আঘাত হেনেছি।”
ইরানের ‘যৌথ অভিযান’ ও বিধ্বংসী অস্ত্রের ব্যবহার
ইরানি বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, এই পাল্টা হামলাটি ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং নিখুঁত। অভিযানে তারা একযোগে জাহাজ বিধ্বংসী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং শক্তিশালী ‘কামিকাজে’ বা আত্মঘাতী ড্রোনের একটি বিশাল ঝাঁক ব্যবহার করেছে। এই অস্ত্রগুলোতে উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন বিস্ফোরক ওয়ারহেড সংযুক্ত ছিল, যা সরাসরি মার্কিন ডেস্ট্রয়ারগুলোকে লক্ষ্য করে নিক্ষেপ করা হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইরানের গোয়েন্দা ড্রোনগুলো হামলার পর নিশ্চিত করেছে যে, মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোর কাঠামোগত মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ইরানি কমান্ডারের দাবি, আগুনের লেলিহান শিখা আর মুহুর্মুহু বিস্ফোরণের মুখে টিকতে না পেরে মার্কিন জাহাজগুলো দ্রুত হরমুজ প্রণালি ছেড়ে প্রস্থান করে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাষ্য: ‘উসকানিহীন হামলা’ ও আত্মরক্ষা
অন্যদিকে, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এই ঘটনাকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছে। তাদের দাবি, ইরানি বাহিনীর এই হামলা ছিল ‘উসকানিহীন’। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বিবৃতিতে বলেন, “ইরান আজ আমাদের সঙ্গে বাড়াবাড়ি করেছে। আমাদের নৌবাহিনী সেখানে আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনেই অবস্থান করছিল।”
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি অনুযায়ী, ইরান ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং ছোট ছোট দ্রুতগামী নৌযান ব্যবহার করে মার্কিন নৌবাহিনীর ওপর হামলা চালায়। জবাবে মার্কিন বাহিনী ‘আত্মরক্ষামূলক’ হামলা চালিয়ে ইরানের বেশ কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, কমান্ড সেন্টার এবং গোয়েন্দা স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিয়েছে। ট্রাম্প অবশ্য যোগ করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র এখনো পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করতে চায় না এবং যুদ্ধবিরতি এখনো প্রযুক্তিগতভাবে কার্যকর আছে বলে তিনি মনে করেন।
উপকূলীয় এলাকায় বোমাবর্ষণ
ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ড জানিয়েছে, মার্কিন বিমান হামলায় বন্দর খামির, সিরিক এবং কেশম দ্বীপের উপকূলীয় এলাকাগুলো লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। তেহরানের স্থানীয় বাসিন্দারাও রাতের অন্ধকারে শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনার কথা জানিয়েছেন। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব
এই সংঘাতের ফলে বর্তমানে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলোর জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ রয়েছে। খাতাম আল-আম্বিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাগারি এই পরিস্থিতিকে মার্কিন ‘সামুদ্রিক দস্যুতা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “যেকোনো ধরনের আগ্রাসনের দাঁতভাঙা জবাব দিতে ইরান প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
হরমুজ প্রণালি হলো বিশ্বের জ্বালানি তেলের ধমনী। এখান দিয়ে প্রতিদিন বিশ্ব বাজারের ২০ শতাংশ তেল পরিবাহিত হয়। ফলে এই পথে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধস নামার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
বিডি নিউজ সত্যকথা বিশ্লেষণ
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই পাল্টাপাল্টি হামলা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। বিডি নিউজ সত্যকথা-এর বিশ্লেষণে তিনটি প্রধান দিক উঠে এসেছে:
১. যুদ্ধবিরতির ভঙ্গুরতা: মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে দুই দেশ যেখানে শান্তি চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছেছিল, সেখানে এই সংঘাত প্রমাণ করে যে উভয় পক্ষের মধ্যে আস্থার সংকট কতটা গভীর। মূলত ট্রাম্পের ‘অধিকতর চাপ’ এবং ইরানের ‘প্রতিরোধ’ নীতি একে অপরের মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে।
২. সামরিক সক্ষমতার মহড়া: আইআরজিসি যেভাবে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোনের সমন্বয়ে যৌথ অভিযানের দাবি করেছে, তা মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য একটি বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ। এটি পরিষ্কার যে ইরান এখন আর কেবল প্রতিরক্ষা নয়, বরং সক্রিয় প্রতিরোধের মাধ্যমে মার্কিন প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
৩. তেহরানের অভ্যন্তরীণ চাপ: ইরানের অভ্যন্তরে কট্টরপন্থীদের পক্ষ থেকে সরকারের ওপর চাপ রয়েছে যেন তারা মার্কিন উসকানির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়। এই অভিযান সেই অভ্যন্তরীণ জনমতকে শান্ত করার একটি কৌশল হতে পারে। তবে এটি যদি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দিকে যায়, তবে তা ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র—উভয় দেশের জন্যই আত্মঘাতী হবে।
আরও পড়ুন: বাংলার মসনদে নজিরবিহীন সংকট: পদত্যাগে নারাজ মমতা, বরখাস্ত না রাষ্ট্রপতি শাসন—কোন পথে পশ্চিমবঙ্গ?
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন