![]() |
| ইরানের পাহাড়ি এলাকায় মার্কিন পাইলট উদ্ধারের প্রতীকী দৃশ্য |
যেভাবে ভূপাতিত হলো ‘অজেয়’ এফ-১৫
পেন্টাগন এবং হোয়াইট হাউসের তথ্যমতে, ইরানের গভীরে একটি স্পর্শকাতর লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর সময় বিমানটি আক্রান্ত হয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, “এটি ছিল ভাগ্যের এক নির্মম পরিহাস। মাত্র কয়েক হাজার ডলার মূল্যের একটি হাতে বহনযোগ্য শোল্ডার মিসাইল বা ‘ম্যানপ্যাড’ সরাসরি বিমানের ইঞ্জিনের ভেতরে ঢুকে যায় এবং সেটিকে মুহূর্তের মধ্যেই অকেজো করে দেয়।”
সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এফ-১৫ বিমানগুলো সাধারণত অনেক উচ্চতায় ওড়ার ক্ষমতা রাখে, কিন্তু ইরানের ড্রোন কারখানা ও ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা ধ্বংসের অভিযানে বিমানটিকে নিচু দিয়ে উড়তে হয়েছিল। আর সেই সুযোগটিই নিয়েছে ইরানি বাহিনী বা তাদের সমর্থিত কোনো ছোট গোষ্ঠী।
৪৮ ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস উদ্ধার অভিযান
বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার পর দুই পাইলটকে উদ্ধার করতে যুক্তরাষ্ট্রকে যে অভিযান চালাতে হয়েছে, তাকে ‘হলিউড সিনেমাকেও হার মানানো নাটকীয়তা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন ট্রাম্প। বিমান থেকে দুই পাইলট প্যারাশুটে করে নামলেও তারা আলাদা আলাদা জায়গায় গিয়ে পড়েন।
একজন পাইলটকে দ্রুত উদ্ধার করা সম্ভব হলেও অন্যজন ইরানের একটি দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আটকা পড়েন। নিজেকে আড়াল করতে তিনি গুহা ও ঝোপঝাড়ে আশ্রয় নেন। ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, সিআইএ এবং স্পেশাল ফোর্সেস যৌথভাবে ড্রোন ও স্যাটেলাইটের মাধ্যমে তার অবস্থান শনাক্ত করে। ৪৮ ঘণ্টা ধরে ওই পাইলট আহত অবস্থায় নিজের প্রাথমিক চিকিৎসা নিজেই করেন এবং মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে সংকেতের মাধ্যমে যোগাযোগ বজায় রাখেন। অবশেষে ২০টিরও বেশি সামরিক বিমানের সুরক্ষাবলয় তৈরি করে একটি বিশেষ কমান্ডো দল তাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল সামরিক ক্ষয়ক্ষতি
তবে এই উদ্ধার অভিযান সফল হলেও যুক্তরাষ্ট্রকে চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। পেন্টাগন নিশ্চিত করেছে যে, উদ্ধারকারী দলকে সুরক্ষা দিতে গিয়ে মার্কিন বাহিনী আরও একটি এ-১০ (A-10) অ্যাটাক জেট, দুটি এমসি-১৩০জে (MC-130J) হারকিউলিস স্পেশাল মিশন ক্রাফট এবং অন্তত একটি অত্যাধুনিক হেলিকপ্টার হারিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েক হাজার ডলারের ইরানি মিসাইলের বিপরীতে কয়েকশ মিলিয়ন ডলারের মার্কিন সরঞ্জাম ধ্বংস হওয়া একটি বড় কৌশলগত ধাক্কা।
ইরানের সক্ষমতা ও ট্রাম্পের সতর্কতা
ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, গত ছয় সপ্তাহের অভিযানে ইরানের নৌ ও বিমানবাহিনী প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের তথ্যমতে, এখন পর্যন্ত ১৩ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে এবং ১৫০টিরও বেশি ইরানি জাহাজ ধ্বংস করা হয়েছে। তবে তা সত্ত্বেও ইরান থেকে এখনো বড় ধরণের নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে বলে তিনি সতর্ক করেন। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী নিয়ে তিনি বলেন, “আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারি, কিন্তু বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে একজন ব্যক্তিই যথেষ্ট।” তিনি প্রয়োজনে ইরানে স্থলবাহিনী পাঠানোর বিষয়টিও বিবেচনার মধ্যে রেখেছেন বলে ইঙ্গিত দেন।
আরও পড়ুন: ২০২৬ বিশ্বকাপ বয়কটের মুখে ইরান: যুক্তরাষ্ট্র-ইরান দ্বন্দ্বে ফিফার ‘প্ল্যান এ’ কি সফল হবে?
বিডি নিউজ সত্যকথা বিশ্লেষণ: আধুনিক যুদ্ধের নতুন রূপ ও আকাশপথের চ্যালেঞ্জ
বিডি নিউজ সত্যকথা-র বিশেষ বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ইরানের এই আক্রমণ বিশ্ব সামরিক ব্যবস্থায় এক নতুন সমীকরণ হাজির করেছে।
অসামঞ্জস্যপূর্ণ যুদ্ধের (Asymmetric Warfare) ঝুঁকি: ট্রাম্প নিজেই স্বীকার করেছেন যে ছোট গোষ্ঠী বা ব্যক্তিরা বড় হুমকি হতে পারে। একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের বিলিয়ন ডলারের বিমান যখন কয়েক হাজার ডলারের মিসাইলে ধ্বংস হয়, তখন বুঝতে হবে প্রযুক্তির চেয়েও যুদ্ধের কৌশল এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ম্যানপ্যাড-এর রহস্য: ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (IISS) মতে, ইরানের কাছে রাশিয়ার ইগলা বা নিজস্ব প্রযুক্তির ‘মিসাগ’ মিসাইল রয়েছে। এই মিসাইলগুলো আকারে ছোট হওয়ায় গাড়ির ডিকিতেও বহন করা যায়। এটি মার্কিন বিমানবাহিনীর জন্য আকাশপথে নতুন আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মানবিক ও রাজনৈতিক চাপ: দুই পাইলটকে উদ্ধারে এত বড় ঝুঁকি নেওয়া প্রমাণ করে যে, ট্রাম্প প্রশাসন অভ্যন্তরীণ জনমতের চাপে রয়েছে। কোনো পাইলট যদি ইরানের হাতে বন্দি হতো, তবে সেটি ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনতো।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা: এই ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর হামলা আরও জোরালো করতে পারে, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন