আন্তর্জাতিক ডেস্ক | বিডি নিউজ সত্যকথা
![]() |
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আবহে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মেঘ চুরির চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। ছবি: প্রতীকী। |
সাংসদ থেকে সাধারণ মানুষ: যখন গুজবে সিলমোহর
এই অদ্ভুত দাবির পালে হাওয়া লাগে যখন ইরাকের প্রভাবশালী সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল-খাইকানি একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বিস্ফোরক মন্তব্য করেন। আল-রাশিদ টিভিকে দেওয়া সেই সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, প্রতিবেশী তুরস্ক ও ইরান নাকি অভিযোগ করেছে যে যুক্তরাষ্ট্র বিশেষ ধরনের বিমান ব্যবহার করে মেঘ ‘ভেঙে ফেলা’ এবং ‘চুরি’ করার চেষ্টা করছে। কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ছাড়াই তিনি আরও যোগ করেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইরাকে বৃষ্টি ফিরে এসেছে কেবল এই কারণে যে, যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরানের সাথে যুদ্ধ নিয়ে ‘ব্যস্ত’, তাই তারা আর মেঘ সরানোর সময় পাচ্ছে না।
তুরস্কের নেটিজেনদের একাংশও এই দাবিতে সোচ্চার। দেশটির আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ৬৬ বছরের মধ্যে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। অনেকের মতে, এই অতিবৃষ্টির কারণ হলো আকাশপথ বন্ধ থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের মেঘ সরানোর সক্ষমতা কমে যাওয়া।
বিজ্ঞান কী বলছে? মেঘ কি আসলেই চুরি সম্ভব?
বিবিসি বাংলার এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বিজ্ঞানীরা এই দাবিকে সরাসরি ‘ভিত্তিহীন’ ও ‘অবৈজ্ঞানিক’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। ইরাকের আবহাওয়া অধিদপ্তরের মুখপাত্র আমের আল-জাবেরি স্পষ্ট জানিয়েছেন, ২০২৬ সালে ইরাকে প্রচুর বৃষ্টিপাত হওয়ার পূর্বাভাস গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসেই দেওয়া হয়েছিল, যা বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতির অনেক আগের ঘটনা।
বিজ্ঞানীদের মতে, আকাশ থেকে মেঘকে ‘পকেটে’ ভরে বা অন্য দেশে পাচার করার মতো কোনো প্রযুক্তি এখনো মানবজাতির হাতে আসেনি। বায়ুমণ্ডল এবং জলবায়ু একটি অত্যন্ত জটিল ও বিশাল ব্যবস্থা, যা কোনো একটি দেশের একক প্রচেষ্টায় সম্পূর্ণ বদলে দেওয়া সম্ভব নয়।
ভুল বোঝা ‘ক্লাউড সিডিং’ ও এর সীমাবদ্ধতা
এই ষড়যন্ত তত্ত্বের মূলে রয়েছে ‘ক্লাউড সিডিং’ (Cloud Seeding) নামক একটি প্রকৃত বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া। এটি এমন একটি পদ্ধতি যেখানে সিলভার আয়োডাইড নামক কণা মেঘের ওপর ছড়িয়ে দিয়ে বৃষ্টির ফোঁটা তৈরিতে সাহায্য করা হয়। সংযুক্ত আরব আমিরাত, চীন এবং যুক্তরাষ্ট্র এই পদ্ধতি ব্যবহার করে।
তবে আবুধাবির খলিফা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডায়ানা ফ্রান্সিস বলেন, “ক্লাউড সিডিং কোনো জাদুর কাঠি নয়। এটি কেবল আগে থেকেই থাকা একটি মেঘকে সামান্য ‘ধাক্কা’ দিয়ে সর্বোচ্চ ১০-১৫ শতাংশ বৃষ্টিপাত বাড়িয়ে দিতে পারে। এটি পুরো আকাশ থেকে মেঘ গায়েব করতে পারে না।” ওযাইওমিং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী ড. জেফ ফ্রেঞ্চও একমত হয়ে জানান, এক জায়গায় কৃত্রিম বৃষ্টি নামালে পাশের দেশ মরুভূমি হয়ে যাবে—এমন দাবির কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ আজও পাওয়া যায়নি।
আসল অপরাধী ‘জলবায়ু পরিবর্তন’
বিশেষজ্ঞদের মতে, মেঘ চুরি নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই মধ্যপ্রাচ্যে চরম আবহাওয়ার সৃষ্টি হচ্ছে। জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি ও পরিবেশ ইনস্টিটিউটের পরিচালক কাবে মাদানি বলেন, “মানুষের অবিশ্বাস এবং জলচক্র সম্পর্কে অজ্ঞতাই এই গুজব ছড়ানোর মূল কারণ।”
কয়লা, গ্যাস এবং তেল পোড়ানোর ফলে বিশ্বের তাপমাত্রা বাড়ছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (WMO) তথ্যমতে, মধ্যপ্রাচ্যে তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার বৈশ্বিক গড়ের দ্বিগুণ। এর ফলে বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে গেছে। কোথাও দীর্ঘ খরা, আবার কোথাও কয়েক ঘণ্টার প্রবল বৃষ্টিতে আকস্মিক বন্যা দেখা দিচ্ছে। এই অস্থির আবহাওয়াকেই মানুষ ‘মেঘ চুরি’ বলে ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছে।
কেন মানুষ এই ষড়যন্ত তত্ত্বে বিশ্বাস করে?
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু বিজ্ঞানী ড. সারা স্মিথ মনে করেন, জটিল ও অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে মানুষ সহজ ব্যাখ্যা খুঁজে নিতে পছন্দ করে। মধ্যপ্রাচ্যের মানুষের মধ্যে পানি নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের যে ভয় এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা রয়েছে, তা থেকেই এই ধরনের মনগড়া গল্পের সৃষ্টি হয়। মানুষ যখন বুঝতে পারে না কেন বৃষ্টি হচ্ছে না, তখন তারা কোনো একটি ‘অদৃশ্য শত্রু’ বা ‘পরমাণু শক্তিধর দেশ’কে দায়ী করে তৃপ্তি পায়।
আরও পড়ুন: আইরিনের হ্যাটট্রিকে সিঙ্গাপুরকে উড়িয়ে ফাইনালে বাংলাদেশ
বিডি নিউজ সত্যকথা বিশ্লেষণ
'বিডি নিউজ সত্যকথা' মনে করে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো এই ‘মেঘ চুরি’ তত্ত্ব কেবল একটি গুজবই নয়, বরং এটি সাধারণ মানুষের বিজ্ঞানবিমুখতার একটি চরম উদাহরণ। যখন কোনো অঞ্চলে চরম খরা বা প্রাকৃতিক বিপর্যয় নেমে আসে, তখন তার পেছনের জলবায়ুগত কারণগুলো অনুসন্ধান না করে প্রভাবশালী দেশগুলোকে দায়ী করা একটি সস্তা রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে পানি নিয়ে যে রাজনৈতিক লড়াই চলছে, এই গুজব সেই উত্তজনাকেই আরও উসকে দিচ্ছে। অথচ সমাধান রয়েছে বৃক্ষরোপণ, কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং আধুনিক পানি ব্যবস্থাপনার মধ্যে। গুজব নয়, বরং বিজ্ঞানের ওপর ভিত্তি করেই আমাদের আগামীর পৃথিবীর সংকট মোকাবিলা করতে হবে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন