লাইফস্টাইল ডেস্ক | বিডি নিউজ সত্যকথা
গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমে আমাদের শরীরের মেটাবলিজম বা বিপাক হার কিছুটা ধীর হয়ে যায়। ভারতের প্রখ্যাত ন্যাচারোপ্যাথি ও যোগ বিশেষজ্ঞ ডা. নরেন্দ্র কে শেঠি বলেন, "গরম আবহাওয়ায় শরীর নিজেকে ঠান্ডা রাখতে ব্যস্ত থাকে, ফলে পরিপাকতন্ত্রে রক্ত সঞ্চালন কিছুটা কমে যায়। এতে হজমের গতি ধীর হয়।"
শরীরে পানির ঘাটতি দেখা দিলে পাকস্থলীর হজম রস ঘন হয়ে যায়, যা খাবার ভাঙতে বাধা দেয়। এছাড়া উষ্ণ পরিবেশে ব্যাকটেরিয়া দ্রুত বংশবিস্তার করে বলে এ সময়ে খাদ্যে বিষক্রিয়া বা ফুড পয়জনিংয়ের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। ফলে অ্যাসিডিটি, পেট ফাঁপা বা খাবারের পর বুক জ্বালাপোড়ার মতো সমস্যা ঘরে ঘরে দেখা দেয়।
গরমে অবসাদ ও ক্লান্তির নেপথ্যে বিজ্ঞান
অতিরিক্ত গরমে শরীর নিজেকে ঠান্ডা রাখতে প্রচুর ঘাম তৈরি করে। এই ঘামের মাধ্যমে শরীর থেকে শুধু পানি নয়, প্রয়োজনীয় লবণ ও ইলেক্ট্রোলাইটও বেরিয়ে যায়। ফলে রক্তসঞ্চালন ধীর হয়ে পড়ে এবং মস্তিষ্কে ও শরীরের কোষে অক্সিজেন সরবরাহ কমে যায়। এর ফলেই আমরা দ্রুত ক্লান্তিবোধ করি, মাথা ঘোরে বা দুর্বলতা অনুভব করি।
গরমে সুস্থ থাকার ৭টি বিশেষ টিপস: জীবনযাত্রার পরিবর্তন
চিকিৎসকরা এই তীব্র গরমে নিজেকে ফিট রাখতে নিচের বিষয়গুলোর ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন:
১. পানি পান ও হাইড্রেশন: তৃষ্ণার জন্য অপেক্ষা না করে সারাদিন অল্প অল্প করে পানি পান করুন। শুধু সাধারণ পানি নয়, খনিজ উপাদানের ভারসাম্য বজায় রাখতে ডাবের পানি, লেবুর শরবত বা ঘরে তৈরি ওআরএস (ORS) পান করুন। খাদ্যতালিকায় তরমুজ, শসা ও কমলার মতো পানিজাতীয় ফল রাখুন।
২. খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন: এই সময়ে গুরুপাক বা অতিরিক্ত তেল-মসলাযুক্ত খাবার বিষের মতো কাজ করে। এগুলো শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এর পরিবর্তে দই, সালাদ, মুগ ডাল এবং প্রচুর সবুজ শাকসবজি খান। সকালে ভেজানো বাদাম বা কলা খেলে দিনভর ভালো এনার্জি পাওয়া যায়।
৩. কড়া রোদ থেকে সুরক্ষা: দুপুর ১২টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত সরাসরি রোদে না যাওয়ার চেষ্টা করুন। জরুরি প্রয়োজনে বের হলে অবশ্যই ছাতা, টুপি বা সুতির স্কার্ফ ব্যবহার করুন। হালকা রঙের সুতির ঢিলেঢালা পোশাক এই সময়ে সবচেয়ে আরামদায়ক।
৪. রোদ থেকে ফিরেই সাবধানতা: বাইরের প্রচণ্ড রোদ থেকে ফিরেই ফ্রিজের কনকনে ঠান্ডা পানি খাবেন না। এতে হিতে বিপরীত হয়ে 'থার্মাল শক' হতে পারে। কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিয়ে সাধারণ তাপমাত্রার পানি পান করুন। একইভাবে ঘাম না শুকিয়ে গোসল করা বা এসির নিচে যাওয়া থেকে বিরত থাকুন।
৫. ঠান্ডা খাবারে নিয়ন্ত্রণ: অনেকে রোদ থেকে ফিরে প্রচুর আইসক্রিম বা ঠান্ডা পানীয় পান করেন। এতে সাময়িক আরাম হলেও গলা ব্যথা বা কাশির সমস্যা হতে পারে। প্রাকৃতিক উপাদান ‘গন্ড কাতিরা’ পানিতে ভিজিয়ে খেলে এটি শরীর ঠান্ডা রাখতে এবং হজমতন্ত্রকে প্রশান্ত করতে জাদুর মতো কাজ করে।
৬. পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও ঘুম: গরমের কারণে শরীর দ্রুত ক্ষয় হয়, তাই রাতে অন্তত ৭-৮ ঘণ্টা গভীর ঘুম নিশ্চিত করুন। এটি শরীরের কোষগুলোকে পুনরায় চাঙ্গা করতে সাহায্য করে।
৭. হালকা ব্যায়াম ও যোগব্যায়াম: তীব্র গরমে জিম বা ভারী ব্যায়াম না করে সকাল বা বিকালে হালকা স্ট্রেচিং বা যোগব্যায়াম করতে পারেন। বিশেষ করে খাবারের পর কয়েক মিনিট 'বজ্রাসনে' বসলে হজম প্রক্রিয়া অনেক উন্নত হয়।
অ্যাসিডিটি ও গ্যাস দূর করার সহজ ঘরোয়া উপায়
ডা. শেঠির মতে, কিছু প্রাকৃতিক উপাদান অ্যাসিডিটি কমাতে অত্যন্ত কার্যকর:
জিরা পানি: এক গ্লাস পানিতে জিরা ফুটিয়ে সেই পানি পান করলে হজম শক্তি বাড়ে।
মৌরি চিবানো: খাবারের পর সামান্য মৌরি চিবিয়ে খেলে বুক জ্বালাপোড়া কমে।
পুদিনা পাতা: পুদিনার শরবত পেট ঠান্ডা রাখে এবং বমি ভাব দূর করে।
খালি পেটে চা-কফি পরিহার: সকালে খালি পেটে চা বা কফি পান করা এই সময়ে অ্যাসিডিটির প্রধান কারণ হতে পারে।
বিডি নিউজ সত্যকথা বিশ্লেষণ:
গ্রীষ্মের এই তীব্র দাবদাহ কেবল প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের এক অশনি সংকেত। আমাদের শরীর একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রা পর্যন্ত মানিয়ে নিতে পারে, কিন্তু বর্তমানের চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ায় শরীরের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ছে। তাই শুধু বাইরের রোদ থেকে বাঁচলেই হবে না, শরীরের অভ্যন্তরীণ 'ইঞ্জিন' অর্থাৎ হজমতন্ত্রকেও শান্ত রাখতে হবে। পর্যাপ্ত পানি পান, পরিমিত খাবার এবং সঠিক বিশ্রাম—এই তিনের সমন্বয়ই আপনাকে এই গরমে সুস্থ রাখতে পারে। মনে রাখবেন, প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম।
আরও পড়ুন: ইরানের অনমনীয় ঘোষণা ও ট্রাম্পের রোববারের ‘ডেডলাইন’
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন