আন্তর্জাতিক ডেস্ক | বিডি নিউজ সত্যকথা
বুধবার (২২ এপ্রিল) ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এক কড়া বিবৃতিতে জানান, হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করা বর্তমানে সম্ভব নয়। ইরানের দাবি, তাদের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌ-অবরোধ মূলত বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করার একটি হীন প্রচেষ্টা। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান শান্তির কথা বললেও তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, কোনো হুমকি বা অবরোধের মুখে নতি স্বীকার করে ইরান আলোচনায় বসবে না।
ইরানি নীতিনির্ধারকদের মতে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এখন তাদের জন্য অস্তিত্বের লড়াই। সামরিক বিশ্লেষক অ্যান্ড্রু পিকের মতে, ইরান বর্তমানে এই জলপথের নিয়ন্ত্রণকেই তাদের ‘বিজয়’ হিসেবে দেখছে। যদি এই পথে জ্বালানি তেল ও বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়, তবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে, যার প্রভাব পড়বে গোটা বিশ্বের সাধারণ মানুষের ওপর।
জাহাজে নাটকীয় অভিযান ও আটক
উত্তজনার আগুনে ঘি ঢেলেছে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সাম্প্রতিক অভিযান। ইরান ঘোষণা দিয়েছে যে, তারা ‘এমএসসি ফ্রান্সেসকা’ এবং ‘এপামিনন্ডাস’ নামক দুটি মালবাহী জাহাজ জব্দ করেছে। আইআরজিসি-র দাবি, জাহাজ দুটি কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই চলাচল করছিল এবং তাদের অবস্থান বা নেভিগেশন সিস্টেমের তথ্য গোপন করে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল।
এই অভিযানের একটি নাটকীয় ফুটেজও প্রচার করেছে তেহরান। গ্রিসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিওর্গোস গেরাপেট্রিটিস নিশ্চিত করেছেন যে, তাদের মালিকানাধীন একটি জাহাজ আক্রান্ত হয়েছে। এছাড়াও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘ইউফোরিয়া’ নামক একটি জাহাজও হামলার মুখে পড়েছিল বলে জানা গেছে। তবে মজার বিষয় হলো, হোয়াইট হাউস এই জাহাজ জব্দের ঘটনাকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে না, কারণ জব্দ করা জাহাজগুলো যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের ছিল না।
ট্রাম্পের অনমনীয় অবস্থান ও রোববারের সময়সীমা
ইসরায়েলি পাবলিক ব্রডকাস্টার 'কান' (KAE) জানিয়েছে, ওয়াশিংটন থেকে তেল আবিবকে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, তেহরানের জন্য ট্রাম্পের দেওয়া সময়সীমা আগামী রোববার শেষ হবে। ইস্তাম্বুল থেকে তারেক শুইরেফের পাঠানো প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প অনির্দিষ্টকালের আলোচনার পরিবর্তে একটি দ্রুত ও চূড়ান্ত সমাধান চান। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট জানিয়েছেন, ট্রাম্প ইরানের বর্তমান অর্থনৈতিক দুর্বল অবস্থানে সন্তুষ্ট এবং তিনি মনে করেন নৌ-অবরোধ সফল হচ্ছে।
এদিকে, এই অস্পষ্ট পরিস্থিতির কারণে ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের মধ্যেও এক ধরনের বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। তারা বলছেন, ট্রাম্পের পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে তারা কেবল সোশ্যাল মিডিয়া বা গণমাধ্যমের মাধ্যমেই জানতে পারছেন। ট্রাম্পের এই ব্যক্তিগত ও হঠাৎ নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো পুরো অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
পেন্টাগনে রহস্যময় রদবদল
সংকট চলাকালীন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনেও ঘটেছে এক রহস্যময় ঘটনা। কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই নৌবাহিনী সচিব জন ফেলানকে অবিলম্বে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যুদ্ধের এই সন্ধিক্ষণে নৌবাহিনী প্রধানের পদত্যাগ সামরিক বিশ্লেষকদের মনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, ইরানের নৌ-অবরোধ মোকাবিলায় ব্যর্থতা বা ট্রাম্পের অনমনীয় কৌশলের সাথে মতবিরোধই এর কারণ হতে পারে।
আলোচনার ভবিষ্যৎ ও পাকিস্তানের ভূমিকা
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় গত ৮ এপ্রিল একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল এবং প্রথম দফার আলোচনাও সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছিল। বর্তমানে ইসলামাবাদে দ্বিতীয় দফার আলোচনার প্রস্তুতি থাকলেও দুই পক্ষের আস্থার সংকটে তা ঝুলে রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন আশা করছে, চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে ইরান একটি ‘একীভূত প্রস্তাব’ নিয়ে এগিয়ে আসবে। কিন্তু ইরান যদি রোববারের মধ্যে কোনো নমনীয় সংকেত না দেয়, তবে মধ্যপ্রাচ্য আবারও একটি বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের মুখোমুখি হতে পারে।
বিডি নিউজ সত্যকথা বিশ্লেষণ:
হরমুজ প্রণালি কেবল একটি জলপথ নয়, এটি বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশ সরবরাহের পথ। ইরান এই পথকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে পশ্চিমাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চাচ্ছে। অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প চাচ্ছেন ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে একটি একতরফা চুক্তিতে সই করাতে। রোববারের এই ডেডলাইন কেবল কূটনৈতিক চাপ নাকি নতুন কোনো যুদ্ধের পূর্বাভাস, তা এখন বিশ্ববাসীর দেখার বিষয়। তবে এই দ্বন্দ্বে যদি সাধারণ বাণিজ্যিক জাহাজগুলো আক্রান্ত হতে থাকে, তবে বিশ্ব অর্থনীতি মুদ্রাস্ফীতির এক নতুন কবলে পড়বে যা কারোর জন্যই সুখকর হবে না।
আরও পড়ুন: মনের শক্তি ফেরাতে ও রিজিকের দুশ্চিন্তা দূর করতে কুরআনের ২০টি অমূল্য পাথেয়
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন