আন্তর্জাতিক ডেস্ক । বিডি নিউজ সত্যকথা
সৌদি আরবের হজ ও ওমরাহ মন্ত্রণালয় তাদের বিবৃতিতে অত্যন্ত জোরালোভাবে জানিয়েছে, হজের পবিত্রতা রক্ষা এবং ভিড় ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বৈধ পন্থার কোনো বিকল্প নেই। অনেক অসাধু চক্র সাধারণ মানুষকে প্রলোভন দেখায় যে তারা টুরিস্ট বা ভিজিট ভিসায় গিয়ে হজ করতে পারবেন। কিন্তু মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করেছে যে, এই ধরনের ভিসা কেবল ভ্রমণের জন্য, হজ পালনের জন্য নয়।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, যারা আইন অমান্য করে অন্য কোনো ভিসায় হজের আনুষ্ঠানিকতায় (যেমন আরাফাত ময়দান বা মিনা) প্রবেশের চেষ্টা করবেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর ফলে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে সৌদি আরব থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার (ডিপোর্ট) এবং ভবিষ্যতে দেশটিতে প্রবেশের ওপর আজীবন নিষেধাজ্ঞাও দেওয়া হতে পারে।
‘নুসুক’ অ্যাপ: অভ্যন্তরীণদের জন্য রক্ষাকবচ
সৌদি আরবে বর্তমানে বসবাসরত নাগরিক (সিটিজেন) এবং প্রবাসী (রেসিডেন্ট)-দের ক্ষেত্রেও নিয়ম কিছুটা কড়াকড়ি করা হয়েছে। তারা চাইলেই হজের পোশাক পরে ময়দানে চলে যেতে পারবেন না। তাদের জন্য সরকারিভাবে অনুমোদিত ‘নুসুক’ (Nusuk) অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে নিবন্ধন করে প্রয়োজনীয় পারমিট বা অনুমতিপত্র সংগ্রহ করতে হবে। অনুমোদিত প্ল্যাটফর্ম ছাড়া অন্য কোনো তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে করা বুকিং বা রিজার্ভেশন সরাসরি বাতিল বলে গণ্য হবে।
প্রতারক চক্র সম্পর্কে সৌদি গেজেটের তথ্য
সৌদি আরবের জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম ‘সৌদি গেজেট’-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতি বছর হজের মৌসুমে একদল আন্তর্জাতিক অসাধু চক্র তৈরি হয় যারা অবৈধভাবে হজে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে হাজার হাজার ডলার হাতিয়ে নেয়। অনেক সময় তারা ভুয়্যা ওয়েবসাইট বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে। এই প্রতারণা দমন করতে এবার সৌদি কর্তৃপক্ষ ডিজিটাল নজরদারি বাড়িয়েছে এবং ওমরাহ বা ভিজিট ভিসাধারীদের মক্কায় প্রবেশের ক্ষেত্রে বিশেষ তল্লাশি চৌকি (চেকপোস্ট) স্থাপন করেছে।
১৮ এপ্রিল: বাংলাদেশ থেকে স্বপ্নের যাত্রা শুরু
সৌদি আরবের এই কঠোর নির্দেশনার মধ্যেই বাংলাদেশে শুরু হয়েছে হজ ফ্লাইটের চূড়ান্ত কাউন্টডাউন। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম হজ ফ্লাইট আগামী ১৮ এপ্রিল রাত ২টায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে জেদ্দার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবে।
এবারের হজ কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। হজযাত্রীদের বিদায় জানাতে এবং হজ ক্যাম্পের সার্বিক ব্যবস্থাপনা পরিদর্শন করতে প্রধানমন্ত্রী যে কোনো দিন আশকোনা হজ ক্যাম্পে যেতে পারেন। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান ইতিমধ্যে বিমানবন্দর এলাকা পরিদর্শন করেছেন এবং হজযাত্রীদের ইমিগ্রেশন ও লাগেজ হ্যান্ডলিং দ্রুততম সময়ে করার জন্য বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করেছেন।
হজযাত্রীদের জন্য কিছু জরুরি নির্দেশনা
১. ভিসা যাচাই: হজযাত্রীদের নিশ্চিত হতে হবে যে তাদের পাসপোর্টে লাগানো ভিসাটি নির্দিষ্ট ‘হজ ভিসা’।
২. নিবন্ধন সনদ: সরকারি বা বেসরকারি যে মাধ্যমেই হোক, মূল নিবন্ধন সনদ এবং আইডেন্টিটি কার্ড সবসময় সাথে রাখতে হবে।
৩. স্বাস্থ্যবিধি: সৌদি আরবের নির্ধারিত স্বাস্থ্যবিধি ও টিকা সনদ সাথে রাখা বাধ্যতামূলক।
৪. অনুমোদিত মাধ্যম: কোনো দালালের মাধ্যমে টাকা লেনদেন না করে সরাসরি নিবন্ধিত এজেন্সির সাথে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।
বিডি নিউজ সত্যকথা বিশ্লেষণ
সৌদি আরবের এই কঠোর ভিসানীতি মূলত হজযাত্রীদের নিরাপত্তাকেই প্রাধান্য দিচ্ছে। গত কয়েক বছরে দেখা গেছে, অনেক মানুষ ভিজিট ভিসায় গিয়ে প্রচণ্ড গরমে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করেন কারণ তাদের কোনো মোয়াল্লেম বা আবাসন ব্যবস্থা থাকে না। এতে যেমন তাদের জীবন ঝুঁকিপূর্ণ হয়, তেমনি হজের মূল শৃঙ্খলা নষ্ট হয়।
আমাদের বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, এবার সৌদি কর্তৃপক্ষ জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে 'নুসুক' অ্যাপের মাধ্যমে সবকিছু সেন্ট্রাল ডাটাবেজে নিয়ে আসায় জালিয়াতি করা প্রায় অসম্ভব। বাংলাদেশের হজযাত্রীদের প্রতি আমাদের পরামর্শ হলো—সরকার নির্ধারিত এজেন্সির বাইরে কারো সাথে চুক্তি করবেন না। মনে রাখবেন, পবিত্র হজ একটি ইবাদত, আর সেই ইবাদতের শুরুটা যদি আইন ভঙ্গ করে বা ভুল ভিসায় হয়, তবে তা আপনার জন্য কেবল আইনি জটিলতাই নয়, আধ্যাত্মিক ক্ষতিরও কারণ হতে পারে। বাংলাদেশ সরকার এবার বিমানে টিকিটের দাম ১২ হাজার টাকা কমিয়ে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, তা সফল করতে সব হজযাত্রীকে নিয়ম মানার আহ্বান জানাচ্ছি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন