আন্তর্জাতিক ডেস্ক | বিডি নিউজ সত্যকথা
![]() |
| হরমুজ প্রণালিতে আনুষ্ঠানিকভাবে নৌ-অবরোধ শুরু করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (প্রতীকী ছবি) |
ট্রাম্পের ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ পোস্ট ও যুদ্ধের হুমকি
অবরোধ কার্যকরের পরপরই নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভাষায় ইরানকে সতর্ক করেন। তিনি বলেন, “ইরানের কোনো জাহাজ যদি অবরুদ্ধ অঞ্চলের কাছে আসার দুঃসাহস দেখায়, তবে কোনো প্রকার সতর্কবার্তা ছাড়াই সেটিকে ধ্বংস করা হবে।” ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, ইরান নৌবাহিনীর একটি বড় অংশ ইতিমধ্যে মার্কিন ও মিত্র বাহিনীর অভিযানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে ইরানের হাতে থাকা কিছু ‘ফাস্ট অ্যাটাক’ জাহাজ এখনও সচল রয়েছে। ট্রাম্প স্পষ্ট করেছেন, এই অবরোধ ভাঙার যেকোনো চেষ্টা হলে ওই ক্ষুদ্র জাহাজগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
হরমুজে রণসজ্জা: স্যাটেলাইটে ধরা পড়ল ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট যখন হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন, তখন সমুদ্রের নীল জলরাশিতে দেখা যাচ্ছে বিশাল সামরিক বহর। বিবিসি ভেরিফাই ও স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, ওমান উপসাগরের পূর্ব প্রান্তে এবং আরব সাগরের কৌশলগত পয়েন্টগুলোতে মার্কিন নৌবাহিনী তাদের অবস্থান শক্ত করেছে। পারমাণবিক শক্তিচালিত বিশাল বিমানবাহী রণতরি ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’কে ইরানের উপকূল থেকে মাত্র ২০০ কিলোমিটার (১২৪ মাইল) দূরে অবস্থান করতে দেখা গেছে। এর সাথে রয়েছে দুটি শক্তিশালী গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার, যারা ‘ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ’-এর অংশ হিসেবে সদা প্রস্তুত। পেন্টাগন জানিয়েছে, ওমান উপসাগর ও আরব সাগর এলাকায় যেকোনো প্রকার সন্দেহজনক গতিবিধি মোকাবিলায় এই বহর মোতায়েন করা হয়েছে।
সেন্টকমের কড়া নির্দেশ: নাবিকদের সতর্কবার্তা
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) থেকে নাবিকদের উদ্দেশে দেওয়া এক বিশেষ সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ এই অবরোধাধীন এলাকায় প্রবেশ করলে বা সেখান থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করলে সেটিকে আটক বা জব্দ করা হতে পারে। এমনকি প্রয়োজনে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে গতিপথ পরিবর্তন করতে বাধ্য করা হবে। সেন্টকম পরিষ্কার করে জানিয়েছে, জাহাজটি কোন দেশের পতাকাবাহী, তা বিবেচনা করা হবে না—অবরোধের নীতি সবার জন্য সমান। তবে তারা এটিও যোগ করেছে যে, ইরান ছাড়া অন্য কোনো নিরপেক্ষ দেশের যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক জাহাজে বাধা দেওয়া হবে না, যদিও কড়া তল্লাশির মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
ইরানের পাল্টা হুমকি: ‘দস্যুতা’র জবাব হবে ভয়াবহ
যুক্তরাষ্ট্রের এই অবরোধকে ‘সামুদ্রিক দস্যুতা’ এবং ‘অবৈধ’ হিসেবে অভিহিত করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। আইআরজিসির এক মুখপাত্র রোষান্বিত কণ্ঠে জানিয়েছেন, “পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরের কোনো বন্দর নিরাপদ থাকবে না যদি ইরানের বন্দরগুলো হুমকির মুখে পড়ে।” এর আগে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকেই ইরান হরমুজ প্রণালিতে তাদের নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছিল। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যদি পাল্টাপাল্টি হিসেবে হরমুজ প্রণালিতে মাইন স্থাপন বা ড্রোন হামলা শুরু করে, তবে তা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা করতে পারে।
আরও পড়ুন: হজে অংশ নিতে ‘হজ ভিসা’ বাধ্যতামূলক: সৌদি আরবের কড়া হুঁশিয়ারি
ক্রেমলিনের উদ্বেগ ও রুশ-ইরান আঁতাত
এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের দপ্তর ক্রেমলিন তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকোভ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে চরম নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ও সিএনএন-এর দাবি অনুযায়ী, ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলা চালাতে স্যাটেলাইট চিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করছে রাশিয়া। যদিও ইউরেনিয়াম স্থানান্তরের রুশ প্রস্তাব ইরান প্রত্যাখ্যান করেছে, তবুও সামরিক ক্ষেত্রে এই দুই দেশের ঘনিষ্ঠতা ওয়াশিংটনের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
জ্বালানি বাজার ও বৈশ্বিক অর্থনীতির ঝুঁকি
বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ সরবরাহ হয় এই সরু হরমুজ প্রণালি দিয়ে। যদি এই নৌপথ দীর্ঘদিনের জন্য অবরুদ্ধ থাকে বা যুদ্ধ শুরু হয়, তবে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ২০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এতে করে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতি ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম হবে আকাশচুম্বী।
বিডি নিউজ সত্যকথা বিশ্লেষণ
হরমুজ প্রণালির এই সংকট এখন আর কেবল আঞ্চলিক দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন একটি বিশ্ব সংকটে রূপ নিয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি ‘ধ্বংস’ করার হুমকি মূলত ইরানকে আলোচনার টেবিলে বাধ্য করার একটি কৌশল হতে পারে, কিন্তু এটি হিতে বিপরীত হওয়ার ঝুঁকিই বেশি। ইরানের আইআরজিসি সাধারণ কোনো বাহিনী নয়; তাদের আত্মঘাতী ড্রোন ও মিসাইল সক্ষমতা মার্কিন নৌবহরের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
আমাদের বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, রাশিয়া ও ইরানের সামরিক জোট এই সংকটে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। রাশিয়া সরাসরি এই যুদ্ধে না জড়ালেও তথ্য ও প্রযুক্তি দিয়ে ইরানকে ছায়া সহায়তা দিচ্ছে, যা যুক্তরাষ্ট্রকে আরও ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। যদি একদিনের জন্যও হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকে, তবে বিশ্ব অর্থনীতি যে ধাক্কা খাবে, তা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে বছরের পর বছর সময় লাগবে। আমরা মনে করি, এই অবস্থায় জাতিসংঘ বা বড় কোনো শক্তির মধ্যস্থতা ছাড়া যুদ্ধের আগুন নেভানো সম্ভব নয়। বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে হরমুজের ওই উত্তাল ঢেউয়ের দিকে—সেখানে শান্তি ফিরবে নাকি বারুদের গন্ধে ভারী হবে বাতাস?

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন