ডেস্ক রিপোর্ট | বিডি নিউজ সত্যকথা
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহতা কোনোভাবেই থামছে না। যাত্রী কল্যাণ সমিতির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ মাসে দেশজুড়ে সড়ক, রেল ও নৌপথে মোট ৬৭০টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৬৮২ জন এবং আহত হয়েছেন ১ হাজার ৭৯৬ জন। এর মধ্যে কেবল সড়কেই ঘটেছে ৬১৬টি দুর্ঘটনা, যেখানে নিহত হয়েছেন ৬১৯ জন।
বিভাগীয় পরিসংখ্যান: ঢাকা শীর্ষে, বরিশালে কম
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে সবচেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে। এই বিভাগে ১৬০টি দুর্ঘটনায় ১৭০ জন নিহত ও ৩২০ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে, সবচেয়ে কম দুর্ঘটনা ঘটেছে বরিশাল বিভাগে। সেখানে ৩০টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৭ জন নিহত ও ১২২ জন আহত হয়েছেন।
রেল ও নৌপথের চিত্র
সড়কপথের পাশাপাশি রেল ও নৌপথও ছিল অনিরাপদ। মার্চ মাসে রেলপথে ৪৫টি দুর্ঘটনায় ৫৪ জন নিহত ও ২২৯ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে, নৌপথে ৯টি দুর্ঘটনায় ৯ জন নিহত, ১৯ জন আহত এবং ৩ জন নিখোঁজ রয়েছেন। যাতায়াতের প্রতিটি মাধ্যমেই মৃত্যুর এই হার জনমনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করছে।
দুর্ঘটনার কারণ ও যানবাহনের ধরন
মার্চ মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় জড়িত ৯৭৫টি যানবাহনের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:
মোটরসাইকেল: ২৬.৭৬% (২২২টি দুর্ঘটনায় ২৩৭ জন নিহত)
ট্রাক, পিকআপ ও লরি: ২১.৬৪%
ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক: ১৪.৫৬%
বাস: ১৩.৮৪%
সিএনজি অটোরিকশা: ৭.২৮%
অন্যান্য (লেগুনা, মাহিন্দ্রা, কার, জিপ): ১৫.৯২%
দুর্ঘটনার ধরনের মধ্যে মুখোমুখি সংঘর্ষ ছিল সবচেয়ে বেশি (৩৭.৬৬%)। এরপরই রয়েছে গাড়ি চাপা বা ধাক্কা দেওয়ার ঘটনা (৩২.৪৬%) এবং নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়া (২১.৪২%)। এছাড়া চলন্ত যানবাহনের চাকায় ওড়না পেঁচিয়ে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।
কেন থামছে না সড়কের এই মড়ক?
(বিডি নিউজ সত্যকথা বিশ্লেষণ)
যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণে সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ উঠে এসেছে:
১. অবাধ মোটরসাইকেল ও ইজিবাইক: জাতীয় মহাসড়কে মোটরসাইকেল এবং কম গতির ব্যাটারিচালিত রিকশার অবাধ চলাচল দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। মোটরসাইকেল চালকদের বেপরোয়া গতি এবং ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতা মৃত্যুর হার বাড়িয়ে দিচ্ছে।
২. অবকাঠামোগত ত্রুটি: মহাসড়কে রোড সাইন, রোড মার্কিং এবং পর্যাপ্ত সড়কবাতির অভাব রাতের বেলায় চালকদের বিভ্রান্ত করছে। এছাড়া অন্ধ বাঁকে গাছপালার কারণে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতাও দুর্ঘটনার জন্য দায়ী।
৩. পরিবহন খাতের বিশৃঙ্খলা: অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং অতিরিক্ত যাত্রী বহন করার প্রবণতা এখনো বন্ধ হয়নি। বিশেষ করে ঈদযাত্রায় বাসের ছাদে বা ট্রাকের ওপর চড়ে যাতায়াত করাকে একটি বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
৪. চাঁদাবাজি ও দীর্ঘ কর্মঘণ্টা: চালকদের নির্দিষ্ট বেতন ও কর্মঘণ্টা না থাকা এবং সড়কে চাঁদাবাজির কারণে চালকরা মানসিক চাপে থাকেন, যা অনেক সময় দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সড়ক দুর্ঘটনা রোধে যাত্রী কল্যাণ সমিতির সুপারিশমালা
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে সরকারের কাছে নিচের গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলো পেশ করেছে:
১. প্রযুক্তির ব্যবহার ও স্মার্ট ভাড়া: সড়কে চাঁদাবাজি ও বিশৃঙ্খলা বন্ধে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং দ্রুত স্মার্ট ভাড়া পদ্ধতি চালু করতে হবে।
২. আমদানি ও নিবন্ধন নিয়ন্ত্রণ: অনিয়ন্ত্রিত মোটরসাইকেল এবং ব্যাটারিচালিত রিকশার আমদানি ও নতুন নিবন্ধন অবিলম্বে বন্ধ করা।
৩. আলোকসজ্জা ও ডিজিটাল ফিটনেস: জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কগুলোতে রাতের বেলা পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা নিশ্চিত করা এবং যানবাহনের ফিটনেস প্রদান পদ্ধতি সম্পূর্ণ ডিজিটাল করা।
৪. লাইসেন্স প্রদানে কড়াকড়ি: বিআরটিএ অনুমোদিত ড্রাইভিং স্কুলের নির্ধারিত ৬০ ঘণ্টার ইনক্লুসিভ প্রশিক্ষণ ছাড়া কোনোভাবেই চালকদের লাইসেন্স প্রদান না করা।
৫. গবেষণা ইউনিট গঠন: সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে একটি বিশেষ 'দুর্ঘটনা গবেষণা ইউনিট' গঠন করা, যারা নিয়মিত রোড সেফটি অডিট পরিচালনা করবে।
৬. সার্ভিস লেন নির্মাণ: গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত মহাসড়কগুলোতে ধীরগতির যানবাহনের জন্য আলাদা সার্ভিস লেন চালু করা।
৭. পরিবহন খাতে সুশাসন: মালিক সমিতির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বন্ধ করে পরিবহন খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া।
৮. চালকদের অধিকার নিশ্চিত: চালকদের জন্য নির্দিষ্ট বেতন কাঠামো এবং কর্মঘণ্টা নির্ধারণ করা যাতে তারা ক্লান্ত অবস্থায় গাড়ি না চালায়।
৯. পথচারী নিরাপত্তা: মহাসড়কগুলোতে পর্যাপ্ত ফুটপাত, জেব্রা ক্রসিং, ওভারপাস এবং রোড সাইন/মার্কিং স্থাপন নিশ্চিত করা।
১০. জনসংখ্যার চাপ কমানো: বিশেষ করে উৎসব বা ঈদযাত্রায় দুর্ঘটনা কমাতে ঢাকার ওপর জনসংখ্যার চাপ কমানোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিকেন্দ্রীকরণ পরিকল্পনা গ্রহণ করা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন