আন্তর্জাতিক ডেস্ক | বিডি নিউজ সত্যকথা
![]() |
| কূটনৈতিক টানাপোড়েন: ইসলামাবাদে সংলাপ ঘিরে অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তা জোরদার (প্রতীকী ছবি)। |
শান্তি আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার নেপথ্য কারণ
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে যে তাণ্ডব শুরু হয়েছিল, তা প্রশমিত করতে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং ইসরায়েল যৌথভাবে দুই সপ্তাহের একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে। এই সময়সীমার মধ্যেই স্থায়ী সমাধানের পথ খুঁজতে আজ শুক্রবার ইসলামাবাদের টেবিলে বসার কথা ছিল দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশ—যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের। কিন্তু গত ৮ এপ্রিল লেবাননে ইসরায়েলি বিমান বাহিনীর আকস্মিক ও ভয়াবহ হামলা সব হিসাব ওলটপালট করে দিয়েছে।
লেবাননের সেই হামলায় নারী ও শিশুসহ অন্তত ২৫৪ জন প্রাণ হারান। আহত হন এক হাজার একশর বেশি মানুষ। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই হামলা ছিল সদ্য ঘোষিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির একটি নগ্ন লঙ্ঘন। ইরান মনে করছে, আলোচনার কথা বলে ইসরায়েল মূলত সময়ক্ষেপণ করছে এবং কৌশলে হামলা অব্যাহত রেখেছে। এই ক্ষোভ থেকেই তেহরান সংলাপ বয়কটের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রাষ্ট্রদূত মোঘাদামের রহস্যময় আচরণ
ইসলামাবাদে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত রেজা আমিরি মোঘাদাম বৃহস্পতিবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি পোস্ট দিয়ে জানিয়েছিলেন যে, প্রতিনিধিদল রাতেই পাকিস্তানের উদ্দেশে যাত্রা করবে। কিন্তু নাটকীয়ভাবে মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরেই তিনি সেই পোস্টটি মুছে ফেলেন। এরপর থেকে শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত ইসলামাবাদের বিমানবন্দরে বা কোনো কূটনৈতিক দফতরে ইরানি প্রতিনিধিদের পৌঁছানোর খবর পাওয়া যায়নি। একইভাবে মার্কিন প্রতিনিধিদের গতিবিধি নিয়েও রহস্য রয়ে গেছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা এই ঘটনাকে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে বড় ধরনের একটি ‘কূটনৈতিক অচলাবস্থা’ হিসেবে দেখছেন।
তেহরানের নতুন শর্ত ও লেবানন ফ্যাক্টর
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ‘কান’-এর দাবি অনুযায়ী, ইরান এখন কেবল গাজা বা ইসরায়েল সীমান্তে যুদ্ধবিরতি চায় না। তারা চায় এই শান্তি আলোচনার সমীকরণে লেবাননকেও একটি পক্ষ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে। লেবানন সরকারও এই আলোচনায় বসতে তাদের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে। কিন্তু ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে লেবাননকে এই চুক্তির আওতায় আনার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো ইতিবাচক সংকেত পাওয়া যায়নি। তেহরানের যুক্তি হলো, যতক্ষণ লেবাননে হামলা বন্ধ না হচ্ছে, ততক্ষণ কোনো আলোচনা ফলপ্রসূ হতে পারে না।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া
ইসলামাবাদের এই অচলাবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ক্রেমলিন থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সংঘাত কবলিত অঞ্চলে শান্তি ফেরাতে সব পক্ষকে ধৈর্য ধারণ করতে হবে। অন্যদিকে, চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে ইরানের প্রস্তাবটি সমর্থন করে। এই আন্তর্জাতিক চাপ ও পাল্টা চাপের কারণে ইসলামাবাদ সংলাপ এখন বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
আরও পড়ুন: শর্ত ভেঙে লেবাননে ইসরায়েলি হামলা: পরমাণু ইস্যুতে অনড় ইরান, ভেস্তে যাচ্ছে শান্তিচুক্তি
মানবিক বিপর্যয় ও আঞ্চলিক অস্থিরতা
গত ৪০ দিনের যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের অবকাঠামো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু এবং লাখ লাখ মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার পর এই দুই সপ্তাহের বিরতি ছিল আশার আলো। কিন্তু ইসলামাবাদের এই সংলাপ যদি শেষ পর্যন্ত সফল না হয়, তবে পুনরায় শুরু হওয়া সংঘাত আগের চেয়েও কয়েক গুণ ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে লেবাননে সাম্প্রতিক হামলার পর ইরান যদি সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তবে তা পুরো অঞ্চলকে একটি মহাযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেবে।
ভবিষ্যৎ রূপরেখা ও শঙ্কা
যদি আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ইরান বা যুক্তরাষ্ট্র কোনো আনুষ্ঠানিক সমঝোতায় না পৌঁছায়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের এই সাময়িক যুদ্ধবিরতি কেবল কাগজের কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে। সমর বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইরান তাদের ছায়াবাহিনী বা প্রক্সি গ্রুপগুলোকে সক্রিয় করার প্রস্তুতি নিতে পারে, যা ইসরায়েলের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। ফলে একটি আঞ্চলিক সংঘাত বৈশ্বিক তেল বাজারে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে এবং এর প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতেও।
বিডি নিউজ সত্যকথা বিশ্লেষণ: পর্দার আড়ালে কী ঘটছে?
বিডি নিউজ সত্যকথা-এর আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক দল এই পরিস্থিতিকে তিনটি প্রধান দিক থেকে পর্যবেক্ষণ করছে:
১. বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট: ট্রাম্প প্রশাসনের চাপে ইসরায়েল আলোচনায় বসতে রাজি হলেও মাঠপর্যায়ে তাদের সামরিক অভিযান বন্ধ হয়নি। এটি ইরানের জন্য একটি বড় উদ্বেগের কারণ। তেহরান মনে করছে, আলোচনা চলাকালীন ইসরায়েল তাদের মিত্রদের (হিজবুল্লাহ) দুর্বল করে দেওয়ার সুযোগ নিচ্ছে।
২. ডোনাল্ড ট্রাম্পের কৌশল: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত ফলাফল চান। কিন্তু নেতানিয়াহু সরকারের অতি-ডানপন্থী নীতি ট্রাম্পের এই শান্তিকামী উদ্যোগকে বারবার বাধাগ্রস্ত করছে। যদি ট্রাম্প ইসরায়েলকে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হন, তবে ইরান আলোচনা টেবিলে ফেরার সম্ভাবনা খুবই কম।
৩. তৃতীয় পক্ষের ভূমিকা: পাকিস্তান এই সংলাপের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করলেও তাদের সক্ষমতা সীমিত। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের কোনো চ্যানেল এখন কার্যকর নেই। ফলে ছোট একটি ভুল বোঝাবুঝিও বড় ধরনের বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, ইসলামাবাদের এই সংলাপ কেবল একটি কূটনৈতিক বৈঠক নয়; এটি ছিল মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরার শেষ সুযোগ। ইরান যদি চূড়ান্তভাবে এই বৈঠক বয়কট করে, তবে বিশ্ববাসীকে আরও একটি রক্তক্ষয়ী সংঘাতের প্রত্যক্ষদর্শী হতে হবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন