তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ইরানের পারমাণবিক শিল্পের একটি মৌলিক এবং অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি ইরানের জন্য একটি ‘রেড লাইন’। পশ্চিমা দেশগুলো বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র বারবার দাবি করে আসছে যে, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে সক্ষম ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে দেওয়া হবে না। এমনকি চলমান শান্তি আলোচনার অন্যতম প্রধান এজেন্ডা ছিল ইরানের এই পরমাণু কর্মসূচিকে একটি নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে আনা। কিন্তু বৈঠকের আগেই ইরানের এমন অনড় অবস্থান আলোচনার ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।
লেবানন ফ্রন্ট ও ট্রাম্পের বিতর্কিত অবস্থান
এই শান্তি প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে লেবানন ফ্রন্ট থেকে। ইরানের ১০ দফা প্রস্তাবের একটি প্রধান শর্ত ছিল ‘সব ফ্রন্টে তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি’। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, যিনি এই আলোচনার অন্যতম মধ্যস্থতাকারী, তিনিও উল্লেখ করেছিলেন যে যুদ্ধবিরতি হবে সর্বত্র। কিন্তু ইসরায়েল এই শর্ত উপেক্ষা করে লেবাননে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর দাবি, লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে তাদের যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি এবং এটি অব্যাহত থাকবে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইসরায়েলের এই অবস্থানকে সমর্থন করেছেন। ট্রাম্প এক বিবৃতিতে বলেন যে, যুদ্ধবিরতির আওতায় লেবানন অন্তর্ভুক্ত নয়। তার মতে, সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর উপস্থিতির কারণেই লেবাননকে এই চুক্তির বাইরে রাখা হয়েছে। ট্রাম্পের এই মন্তব্য ইরানের তোলা ‘বিশ্বাসভঙ্গের’ অভিযোগকে আরও জোরালো করেছে।
মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের হুঁশিয়ারি: ‘আলোচনা এখন অর্থহীন’
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া একটি পোস্টে যুক্তরাষ্ট্রের কড়া সমালোচনা করেছেন। গালিবাফ দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানের ১০ দফা প্রস্তাব গ্রহণ করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ভঙ্গ করেছে।
গালিবাফের মতে লঙ্ঘিত তিনটি প্রধান শর্ত হলো:
১. লেবাননে যুদ্ধবিরতি: প্রস্তাবের প্রথম দফার তোয়াক্কা না করেই ইসরায়েল লেবাননে হামলা চালিয়েছে, যেখানে শত শত বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন।
২. আকাশসীমা লঙ্ঘন: ইরানের ফার্স প্রদেশের লার শহরে একটি অনুপ্রবেশকারী মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে, যা ইরানের আকাশসীমা লঙ্ঘনের স্পষ্ট প্রমাণ।
৩. পারমাণবিক অধিকার: ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে ইরানের অধিকারকে স্বীকৃতি না দেওয়া, যা প্রস্তাবের ষষ্ঠ দফা ছিল।
গালিবাফ তার পোস্টে স্পষ্টভাবে বলেছেন, “শুরু থেকেই আমরা বর্তমান প্রক্রিয়াটি অবিশ্বাসের সঙ্গে অনুসরণ করে আসছি। প্রত্যাশিতভাবেই যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা শুরু হওয়ার আগেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে। এই পরিস্থিতিতে কোনো ধরনের আলোচনা আর অর্থহীন হয়ে পড়েছে।”
আরও পড়ুন: টাইব্রেকারে হংকংকে রুখে দিয়ে এশিয়ান গেমসের টিকিট কাটল বাংলাদেশ
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, তেহরান এখন এই শান্তিচুক্তি থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসার কথা ভাবছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটন বলছে, তারা ইরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি সমৃদ্ধ করতে দেবে না। এই দুই বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা এখন তুঙ্গে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যে শান্তির আশা দেখা গিয়েছিল, তা এখন কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকার ঝুঁকিতে রয়েছে।
বিডি নিউজ সত্যকথা বিশ্লেষণ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই ছায়াযুদ্ধ এবং কূটনৈতিক টানাপোড়েন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এখানে ‘আস্থার সংকট’ প্রধান অন্তরায়। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন একদিকে ইরানকে আলোচনার টেবিলে আনতে চাচ্ছে, অন্যদিকে ইসরায়েলকে লেবাননে হামলার সবুজ সংকেত দিয়ে হিজবুল্লাহকে দুর্বল করতে চাইছে। এটি একটি দ্বিমুখী নীতি, যা ইরান কখনোই মেনে নেবে না।
ইরানের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেবল একটি প্রযুক্তিগত বিষয় নয়, এটি তাদের সার্বভৌমত্বের প্রতীক। মোহাম্মদ এসলামীর বক্তব্য থেকে পরিষ্কার যে, ইরান এই ইস্যুতে কোনো ছাড় দেবে না। অন্যদিকে, ইসরায়েল যদি লেবাননে হামলা বন্ধ না করে, তবে ইরান সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো এই চুক্তিকে মান্যতা দেবে না। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরানোর এই বিশাল উদ্যোগটি অঙ্কুরেই বিনষ্ট হওয়ার পথে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসন যদি ইসরায়েলকে নিয়ন্ত্রণে না আনে, তবে এই ‘১০ দফা প্রস্তাব’ কেবল ইতিহাসের আস্তাকুঁড়েই নিক্ষিপ্ত হবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন