আন্তর্জাতিক ডেস্ক | বিডি নিউজ সত্যকথা
![]() |
| ফ্রান্সে বিপাকে ইলন মাস্ক: এক্স-এর বিরুদ্ধে বড় তদন্ত শুরু। বিডি নিউজ সত্যকথা |
তলবের নেপথ্যে: ‘অপারেশন ২০ এপ্রিল’
প্যারিস প্রসিকিউটর অফিস থেকে জানানো হয়েছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে এক্স-এর বিরুদ্ধে শুরু হওয়া একটি দীর্ঘমেয়াদী তদন্তের অংশ হিসেবে মাস্ক ও প্ল্যাটফর্মটির সাবেক সিইও লিন্ডা ইয়াকারিনোকে ২০ এপ্রিল সশরীরে হাজির হতে বলা হয়েছে। মূলত এক্স-এর অ্যালগরিদম কীভাবে কাজ করে এবং এটি ফ্রান্সের জনগণের মতামত পরিবর্তনে কোনো ভূমিকা রাখছে কি না, তা খতিয়ে দেখাই এই তদন্তের মূল উদ্দেশ্য।
এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, আজ সোমবারই প্যারিসে মাস্কের স্বেচ্ছায় সাক্ষাৎকার দেওয়ার কথা থাকলেও তিনি উপস্থিত হবেন কি না, তা নিয়ে এখন পর্যন্ত ধোঁয়াশা কাটেনি। তবে ফরাসি প্রসিকিউটর লর বেক্যু সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, মাস্ক হাজির না হলেও তদন্তের কার্যক্রম কোনোভাবেই থেমে থাকবে না।
গ্রোক এআই এবং ভয়ংকর সব অভিযোগ
তদন্তের পরিধি বাড়াতে গিয়ে ফরাসি প্রসিকিউটররা এক্স-এর নিজস্ব এআই চ্যাটবট ‘গ্রোক’-এর বিরুদ্ধে মারাত্মক কিছু অভিযোগ যুক্ত করেছেন। অভিযোগ উঠেছে, গ্রোক ব্যবহার করে হলোকাস্ট বা নাৎসি গণহত্যা অস্বীকারের মতো ঘৃণামূলক বক্তব্য ছড়ানো হচ্ছে। শুধু তাই নয়, ডিপফেক প্রযুক্তির মাধ্যমে নারী ও শিশুদের অসংখ্য আপত্তিকর ও নগ্ন ছবি তৈরি করার অভিযোগও উঠেছে এই চ্যাটবটের বিরুদ্ধে।
সেন্টার ফর কাউন্টারিং ডিজিটাল হেট (সিসিডিএইচ) দাবি করেছে, গ্রোক মাত্র ১১ দিনে প্রায় ৩০ লাখ আপত্তিকর ছবি তৈরি করেছে, যার বড় একটি অংশ শিশুদের মতো দেখতে। এই তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর ফ্রান্সের পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যও এক্স এবং এক্সএআই-এর বিরুদ্ধে আলাদা তদন্ত শুরু করেছে।
এক্স-এর প্যারিস অফিসে তল্লাশি ও ‘বাকস্বাধীনতা’ বিতর্ক
এর আগে গত ৩ ফেব্রুয়ারি প্যারিসে এক্স-এর প্রধান কার্যালয়ে ঝটিকা অভিযান চালায় সরকারি কৌঁসুলির সাইবার ক্রাইম ইউনিট। সেই অভিযানে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সার্ভার ও তথ্য জব্দ করা হয় বলে জানা গেছে। ফরাসি কর্তৃপক্ষ সন্দেহ করছে, এক্স শিশুদের পর্নোগ্রাফিক কনটেন্ট সংরক্ষণ বা বিতরণে সহায়তা করেছে এবং সংঘবদ্ধভাবে প্রতারণামূলক তথ্য সংগ্রহে ব্যবহৃত হয়েছে।
তবে এই পুরো বিষয়টিকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ এবং ‘বাকস্বাধীনতার ওপর চরম আঘাত’ হিসেবে বর্ণনা করেছে এক্স কর্তৃপক্ষ। ইলন মাস্ক বারবার দাবি করে আসছেন যে, তার প্ল্যাটফর্ম সত্য ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে। কিন্তু ফরাসি প্রশাসনের মতে, বাকস্বাধীনতার নামে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন এবং মানবতাবিরোধী অপরাধকে প্রশ্রয় দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তদন্তে ফ্রান্সের হাই-প্রোফাইল ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা
বিবিসির তথ্যমতে, এই তদন্তের সূত্রপাত হয়েছে গত জানুয়ারিতে দেয়া দুই ব্যক্তির গোপনীয় তথ্যের ভিত্তিতে। তাদের একজন ফ্রান্সের একজন সংসদ সদস্য এবং অন্যজন সরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তারা দাবি করেছেন, এক্স-এর অ্যালগরিদম বিদেশি হস্তক্ষেপের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে, যা ফ্রান্সের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি।
আন্তর্জাতিক চাপ ও মাস্কের ভবিষ্যৎ
ইলন মাস্কের জন্য এটি কেবল ফ্রান্সের সমস্যা নয়। ব্রাসেলস থেকে লন্ডন পর্যন্ত ডিজিটাল সেফটি আইনের অধীনে এক্স-এর বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। যদি ফরাসি আদালতে মাস্ক বা তার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হয়, তবে বিশাল অংকের জরিমানার পাশাপাশি ফ্রান্সে এক্স-এর কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার মতো কঠিন পরিণতিও হতে পারে। ২০ থেকে ২৪ এপ্রিলের মধ্যে এক্স-এর আরও বেশ কিছু কর্মীকে পর্যায়ক্রমে তলব করা হয়েছে, যা থেকে বোঝা যাচ্ছে ফরাসি প্রশাসন এই বিষয়ে একচুল ছাড় দিতে রাজি নয়।
'বিডি নিউজ সত্যকথা' বিশ্লেষণ: প্রযুক্তি যখন রাজনীতির হাতিয়ার
বিডি নিউজ সত্যকথা-এর বিশ্লেষক প্যানেল মনে করছে, ইলন মাস্ক বনাম ফ্রান্সের এই লড়াই আসলে বিশ্বজুড়ে টেক জায়ান্টদের নিয়ন্ত্রণ করার একটি প্রতীকী যুদ্ধ। এই ঘটনার গভীর কিছু প্রেক্ষাপট নিচে তুলে ধরা হলো:
১. অ্যালগরিদম বনাম সার্বভৌমত্ব: বর্তমান যুগে কোনো দেশের নির্বাচন বা রাজনীতি কেবল ব্যালটে সীমাবদ্ধ নেই। ফেসবুক, এক্স বা টিকটকের অ্যালগরিদম ঠিক করে দেয় একজন ভোটার কী ভাববেন। ফ্রান্স এই 'ডিজিটাল উপনিবেশবাদ'-এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে।
২. এআই-এর নৈতিক সংকট: গ্রোক বা চ্যাটজিপিটির মতো এআই যখন শিশু পর্নোগ্রাফি বা ঘৃণামূলক বক্তব্যের হাতিয়ার হয়, তখন এর দায়ভার কার—মেশিনের নাকি মালিকের? ফ্রান্সের এই তদন্ত ভবিষ্যতে 'এআই রেগুলেশন' বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।
৩. বাকস্বাধীনতার সংজ্ঞা: মাস্কের কাছে বাকস্বাধীনতা মানে সবকিছুর ছাড়পত্র। কিন্তু ইউরোপীয় আইনের কাছে বাকস্বাধীনতা মানে দায়িত্বশীলতা। এই সংঘাত এখন আদালতের কাঠগড়ায়।
৪. রাজনৈতিক প্রভাব: ফ্রান্সে মাস্কের বিরুদ্ধে এই কঠোর অবস্থানের পেছনে আসন্ন নির্বাচন বা ভূ-রাজনৈতিক কোনো সমীকরণ থাকা অস্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে যখন মাস্কের সাথে ট্রাম্প বা রাশিয়ার ঘনিষ্ঠতার গুঞ্জন শোনা যায়, তখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো স্বাভাবিকভাবেই সতর্ক হয়ে ওঠে।
ইলন মাস্ক কি আজ প্যারিসে হাজির হবেন? নাকি তিনি এটিকে অবজ্ঞা করে নতুন কোনো বিতর্কের জন্ম দেবেন? বিশ্ববাসীর নজর এখন প্যারিসের প্রসিকিউটর অফিসের দিকে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, এই তদন্তের ফলাফল শুধু ইলন মাস্কের ভাগ্য নয়, বরং আগামীর ইন্টারনেটের ভবিষ্যৎও নির্ধারণ করে দেবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন