জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের পর এক নজিরবিহীন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে যাত্রা শুরু করেছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ। বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণে উঠে এসেছে বিগত দেড় দশকের শাসনের সমালোচনা, বর্তমান সরকারের চ্যালেঞ্জ এবং আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশের রূপরেখা। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তার ভাষণে ২০২৪ সালের বিপ্লবকে বাংলাদেশের ইতিহাসে ‘অনন্য মাইলফলক’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, হাজারো শহীদের রক্তের বিনিময়ে আজ আমরা এক স্বাধীন ও সার্বভৌম গণতান্ত্রিক সংসদ পেয়েছি।
গণঅভ্যুত্থান: ফ্যাসিবাদের পতন ও নতুন সূচনা
রাষ্ট্রপতি তার ভাষণের শুরুতেই শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে আত্মদানকারী সকল শহীদ ও আহতদের। তিনি বলেন, "এই অভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্যই ছিল ফ্যাসিবাদের চিরস্থায়ী অবসান ঘটানো এবং জনগণের সরাসরি ভোটে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠা করা।" তিনি আরও যোগ করেন, নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত এই সরকার দেশবাসীর সেই বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করবে। একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এই সংসদ গঠিত হয়েছে, যা বিশ্ব গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানো: রিজার্ভ ও মূল্যস্ফীতির সুখবর
বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনামলে দেশের অর্থনীতি যেভাবে বিপর্যস্ত হয়েছিল, সেখান থেকে বর্তমান সরকারের উত্তরণের চিত্র তুলে ধরেন রাষ্ট্রপতি। তিনি কিছু গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সূচক উপস্থাপন করেন:
রিজার্ভের উল্লম্ফন: ২০২৬ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি পেয়ে ৩৪.৭৮ বিলিয়ন ইউএস ডলারে উন্নীত হয়েছে, যা বিগত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ: রাষ্ট্রপতির তথ্যমতে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে মূল্যস্ফীতি কমে ৮.৫৮ শতাংশে নেমে এসেছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, সরকারের বাজার মনিটরিং ও সঠিক মুদ্রানীতির কারণে এটি সামনে আরও কমবে।
আর্থিক খাতে শুদ্ধি অভিযান: দুই শক্তিশালী কমিশন
রাষ্ট্রপতি তার ভাষণে ব্যাংক ও পুঁজিবাজারের বিশৃঙ্খলা নিয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দেন। তিনি ঘোষণা করেন:
১. অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন: ব্যাংক খাতে জনগণের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি চিরতরে বন্ধ করতে এই কমিশন গঠন করা হবে।
২. পুঁজিবাজার তদন্ত কমিশন: বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে পুঁজিবাজারে যেসব বড় ধরনের অনিয়ম ও লুটপাট হয়েছে, তা তদন্ত করে দায়ীদের শাস্তির আওতায় আনতে একটি পৃথক কমিশন কাজ করবে।
আওয়ামী লীগের দুর্নীতি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তার ভাষণে রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে আলোকপাত করে বলেন, "আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশকে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন বানিয়ে ২০০১ সালের জুন মাসে ক্ষমতা থেকে বিদায় নিয়েছিল।" তিনি উল্লেখ করেন যে, পরবর্তীতে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকার ২০০৪ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইন প্রণয়ন করে এবং কঠোর পদক্ষেপের মাধ্যমে দেশকে কলঙ্কমুক্ত করে। যার ফলে ২০০৬ সালের আগেই বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে ‘এশিয়ার ইমার্জিং টাইগার’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিল। তিনি বিশ্বাস করেন, বর্তমান সরকারও সেই ধারাবাহিকতায় দুর্নীতি দমনে সফল হবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন