মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র হিসেব ১১তম দিনে এসে পুরোপুরি বদলে গেছে। সপ্তাহখানেকের মধ্যে ইরানকে পরাজিত করার যে লক্ষ্য নিয়ে ট্রাম্প-নেতানিয়াহু প্রশাসন যাত্রা শুরু করেছিল, বর্তমানে তা চরম অনিশ্চয়তার মুখে। সমরবিদদের মতে, ইরানকে দমানো তো দূরে থাক, পশ্চিমারা এখন এই সংঘাত থেকে সম্মানজনকভাবে ফিরে যাওয়ার পথও খুঁজে পাচ্ছে না।
নেতৃত্বের চমক: মোজতবা খামেনির ‘কৌশলী’ রণনীতি
আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পর অনেকেই ধারণা করেছিলেন ইরান নেতৃত্বশূন্যতায় ভুগবে। কিন্তু নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি পশ্চিমাদের জন্য আরও বেশি ভয়ঙ্কর হয়ে আবির্ভূত হয়েছেন। গত ২০ বছর ধরে নিজেকে প্রস্তুত করা মোজতবা প্রথাগত যুদ্ধের ছক ভেঙে দিয়েছেন। আগে ইরান হামলার আগে সতর্কবার্তা দিলেও, মোজতবার নির্দেশে এখন কোনো আগাম বার্তা ছাড়াই সরাসরি মার্কিন ও ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলোতে নিখুঁত আঘাত হানা হচ্ছে।
আঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে মার্কিন মিত্র ও আর্থিক খাত
ইরানের এবারের রণকৌশল কেবল ইসরায়েল ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ নেই। কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও সম্পদ লক্ষ্য করে হাজার হাজার সস্তা কিন্তু নিখুঁত ড্রোন ছুড়ছে তেহরান।
গোয়েন্দা সাফল্য: ইরাকের ইরবিলে মার্কিন সেনাদের গোপন আস্তানায় নির্ভুল ড্রোন হামলা চালিয়ে ইরান প্রমাণ করেছে যে, পেন্টাগনের গোপন খবরও তাদের নখদর্পণে।
জ্বালানি যুদ্ধ: ইরানের তেল শোধনাগারে হামলার পাল্টা প্রতিশোধ হিসেবে ইরান এখন সরাসরি ইসরায়েলের জ্বালানি স্থাপনাগুলোকে নিশানা করছে।
অর্থনৈতিক বিপর্যয়: সামরিক স্থাপনার বাইরে এবার মার্কিন ও ইসরায়েল সংশ্লিষ্ট বড় বড় ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে সাইবার হামলার ছক কষেছে তেহরান। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এটি ১৯৭৩ সালের ওপেক তেল নিষেধাজ্ঞার চেয়েও ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে।
ব্যর্থ ‘দাহিয়া’ নীতি ও ইরানি জাতীয় ঐক্য
ইসরায়েল ও ট্রাম্প প্রশাসনের মূল পরিকল্পনা ছিল ‘দাহিয়া’ নীতি প্রয়োগ করা—অর্থাৎ বেসামরিক জনগণের ওপর অবিরাম হামলা চালিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ উসকে দেওয়া। কিন্তু কুর্দি বা বালুচদের মতো সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোকে বিদ্রোহী করার যে চেষ্টা আমেরিকা করেছিল, তা হিতে বিপরীত হয়েছে। হাজার হাজার বোমার আঘাত ইরানিদের বিভক্ত করার বদলে আরও বেশি ঐক্যবদ্ধ করে তুলেছে।
পর্দার আড়ালে রাশিয়া-চীন অক্ষ
এই অসম যুদ্ধে ইরান একা লড়ছে না। মস্কো এবং বেইজিং সরাসরি ইরানকে অত্যাধুনিক সামরিক প্রযুক্তি, স্যাটেলাইট গোয়েন্দা তথ্য এবং সাইবার সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। জাতিসংঘের কাঠামোর বাইরে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এই একতরফা যুদ্ধ চীন ও রাশিয়াকে ইরানের আরও কাছাকাছি নিয়ে এসেছে, যা ওয়াশিংটনের জন্য একটি বড় ভূ-রাজনৈতিক পরাজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পেন্টাগনের উদ্বেগ ও হাইপারসোনিক আতঙ্ক
পেন্টাগন স্বীকার করেছে যে, যুদ্ধে বেশ কিছু মার্কিন সেনা নিহত ও শতাধিক আহত হয়েছে। এছাড়া থাড (THAAD) ইন্টারসেপ্টরসহ মূল্যবান বিমান প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের মজুদে বড় টান পড়েছে। সমরবিদদের মতে, ইরান এখনও তাদের তুরুপের তাস অর্থাৎ ‘হাইপারসোনিক ক্ষেপণাস্ত্র’ বড় কোনো লক্ষ্যের জন্য জমিয়ে রেখেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই দাবানল এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখান থেকে পিছু হটার কোনো উপায় নেই নেতানিয়াহু ও ট্রাম্পের সামনে। আংশিক বিজয়ের সুযোগ নেই আর পূর্ণাঙ্গ বিজয় এখন দিবাস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। ইরান বুঝিয়ে দিয়েছে, তারা কেবল পাল্টা আঘাত করতেই জানে না, বরং শত্রু পক্ষকে দীর্ঘস্থায়ী ফাঁদে আটকে ফেলার শিল্পেও তারা পারদর্শী।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন