সত্যকথা ডেস্ক
মার্কিন সামরিক বাহিনীর শ্রেষ্ঠত্বের সামনে ইরান এখন আর একা নয়। দেশটির অদম্য প্রতিরোধের নেপথ্যে কাজ করছে রুশ ও চীনা প্রযুক্তির এক অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী দেয়াল। সরাসরি যুদ্ধে না জড়ালেও তেহরানকে আধুনিক মিসাইল গাইডেন্স এবং জ্যামিং সিস্টেম সরবরাহ করে মার্কিন অগ্রযাত্রাকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে এই দুই বৈশ্বিক শক্তি।
দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের প্রস্তুতিতে তেহরান
গত ৩ মার্চ ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব আলী লারিজানির বরাতে 'মিডল ইস্ট মনিটর' একটি চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, ইরান এখন আর কোনো সাময়িক যুদ্ধবিরতি নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একটি দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই যুদ্ধের জন্য পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া ও চীনের প্রযুক্তিগত সমর্থনই ইরানকে এই কঠিন লড়াইয়ের ময়দানে টিকে থাকার সাহস ও শক্তি যোগাচ্ছে।
মহাকাশে চীনের ‘বেইদু-৩’ এবং ইরানের নিখুঁত লক্ষ্যভেদ
৫ মার্চ সংবাদ ম্যাগাজিন ‘দ্য ক্রাডেল’-এর একটি বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের বিশাল স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক এখন পশ্চিম এশিয়ার আকাশে পাহারাদারের ভূমিকা পালন করছে। ওয়াশিংটন বা তেল আবিব যখনই তাদের কোনো সেনা মোতায়েন করছে বা যুদ্ধজাহাজ সরাচ্ছে, চীনের স্যাটেলাইটগুলো সেই গোপন তথ্য মুহূর্তের মধ্যে ইরানকে জানিয়ে দিচ্ছে।
ইরানের হাতে থাকা চীনা প্রযুক্তির মূল দিকগুলো:
বেইদু-৩ নেভিগেশন সিস্টেম: মহাকাশে থাকা ৩০টিরও বেশি চীনা স্যাটেলাইট ইরানকে একদম নিখুঁত সিগন্যাল পাঠায়, যা ড্রোন বা মিসাইলকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সাহায্য করে।
মার্কিন জ্যামিং ব্যর্থ: চীনের এই উন্নত সিগন্যাল ব্যবস্থার কারণে আমেরিকার ড্রোন বা মিসাইল জ্যামিং প্রযুক্তি ইরানের ওপর তেমন প্রভাব ফেলতে পারছে না।
বাণিজ্যিক স্যাটেলাইটের গোয়েন্দাগিরি: চীনের 'মিজার ভিশন' বা 'চ্যাংগুয়াং'-এর মতো বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট কোম্পানিগুলো কাতার, জর্ডান ও সৌদি আরবে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটির হাই-রেজোলিউশন ছবি সরাসরি তেহরানকে সরবরাহ করছে।
রুশ ইলেকট্রনিক জ্যামিং: অন্ধ হয়ে যাচ্ছে মার্কিন মিসাইল
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের দাবি অনুযায়ী, রাশিয়া ইরানকে শুধু সরঞ্জাম নয়, বরং উন্নত সাইবার যুদ্ধ এবং ইলেকট্রনিক জ্যামিংয়ের এমন প্রযুক্তি দিয়েছে যা মার্কিন রাডারের ধরাছোঁয়ার বাইরে।
রুশ প্রযুক্তির প্রভাব:
ক্রাসুখা-৪ ও মারমানস্ক-বিএন: এই সিস্টেমগুলো ৩০০ থেকে ৫০০ কিলোমিটার দূর থেকেই শত্রুর জিপিএস ও স্যাটেলাইট সিগন্যাল সম্পূর্ণ জ্যাম করে দিতে পারে।
স্টারলিংক ও গাইডেড মিসাইল বিপর্যয়: এই রুশ জ্যামিং প্রযুক্তির কারণেই সম্প্রতি মার্কিন গাইডেড মিসাইল এবং স্টারলিংক ইন্টারফেসের কার্যকারিতা ব্যাপকভাবে কমে গেছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
গোপন কৌশল বিনিময়: যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অত্যাধুনিক মিসাইলগুলো কীভাবে কাজ করে এবং সেগুলোকে কীভাবে ফাঁকি দেওয়া যায়, সেই অতি গোপনীয় তথ্যও রাশিয়া সরাসরি ইরানকে প্রদান করছে।
এক মেরুকেন্দ্রিক বিশ্বের অবসান
সরাসরি সরকারি হস্তক্ষেপ এড়িয়ে বেসরকারি ও বাণিজ্যিক কোম্পানির মাধ্যমে চীন যেভাবে ইরানকে সামরিক সহায়তা দিচ্ছে, তা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। অন্যদিকে রাশিয়ার সাইবার ও জ্যামিং প্রযুক্তি মার্কিন সামরিক সক্ষমতাকে প্রতিনিয়ত প্রশ্নের মুখে ফেলছে। এই দুই পরাশক্তির মদদে ইরান এখন মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার একচ্ছত্র আধিপত্যের জন্য সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন