মধ্যপ্রাচ্যের চলমান মহাসংঘাতের আঁচ এবার দক্ষিণ এশিয়ায় এসে লেগেছে। একদিকে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন নৌবাহিনীকে ভারতীয় বন্দর ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার দাবিকে ‘ভিত্তিহীন ও মিথ্যা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে নয়াদিল্লি। অন্যদিকে, ইরান থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্রের নতুন বহর ধেয়ে আসার খবরে কাঁপছে পুরো ইসরায়েল।
ভারতকে জড়ানোর মার্কিন চেষ্টা: কড়া জবাব নয়াদিল্লির
বুধবার (৪ মার্চ) ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানায়, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মার্কিন নৌবাহিনীকে ভারতীয় বন্দর ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলে যে তথ্য ছড়ানো হচ্ছে, তার কোনো বিন্দুমাত্র সত্যতা নেই।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রতিরক্ষা সচিবের উপদেষ্টা ডগলাস ম্যাকগ্রেগর একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে দাবি করেন, চলমান সংঘাতে কৌশলগত কারণে মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজগুলো ভারতীয় বন্দর ব্যবহার করতে পারে। এই মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, “ভারতীয় বন্দরগুলো মার্কিন নৌবাহিনী ব্যবহার করছে বলে যে দাবি করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এ ধরনের ভিত্তিহীন বিভ্রান্তি ছড়ানোর বিষয়ে আমরা সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সতর্ক করছি।”
শ্রীলঙ্কা উপকূলে ইরানি জাহাজে হামলা: সতর্ক অবস্থানে নৌবাহিনী
নয়াদিল্লি জানিয়েছে, শ্রীলঙ্কা উপকূলে একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজে মার্কিন সাবমেরিন হামলার ঘটনাটি ভারত অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, ক্ষতিগ্রস্ত ইরানি জাহাজটি সম্প্রতি ভারতে আয়োজিত একটি বহুজাতিক সামরিক মহড়া শেষ করে ফেরার পথে এই হামলার শিকার হয়। ভারতের সমুদ্রসীমার এত কাছে এই হামলা এবং তাতে মার্কিন সাবমেরিনের সংশ্লিষ্টতা নয়াদিল্লির জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভারত নিজের নিরপেক্ষ অবস্থান এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখতেই মার্কিন বাহিনীকে বন্দর ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি নাকচ করে দিয়েছে।
ইসরায়েলে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা: রেড অ্যালার্ট জারি
এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে উত্তেজনা কমার কোনো লক্ষণ নেই। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, ইরান থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের একটি বিশাল নতুন বহর ইসরায়েলের দিকে ধেয়ে আসছে।
বুধবার রাতে এক জরুরি বিবৃতিতে আইডিএফ জানায়, তারা আকাশপথে ইরানের নতুন এই আক্রমণ শনাক্ত করেছে। বিবৃতির পরপরই তেল আবিবসহ ইসরায়েলের বড় শহরগুলোতে সাইরেন বাজতে শুরু করে। আইডিএফ-এর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, “আমাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (আইরন ডোম ও অ্যারো) সক্রিয় রয়েছে এবং ধেয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে কাজ করছে।”
ইসরায়েলের ‘হোম ফ্রন্ট কমান্ড’ ইতিমধ্যে প্রতিটি বাসিন্দার মোবাইল ফোনে সরাসরি আগাম সতর্কবার্তা পাঠিয়েছে। নাগরিকদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়স্থল বা বাঙ্কারে অবস্থান নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তেহরানের এই নিরবচ্ছিন্ন হামলা ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে বলে মনে করছেন সামরিক বিশেষজ্ঞরা।
ত্রিমুখী সংকটে নয়াদিল্লির ‘টাইট রোপ ওয়াকিং’
ইরান ও ইসরায়েল—উভয়ই ভারতের কৌশলগত মিত্র। একদিকে জ্বালানি নিরাপত্তা এবং চাবাহার বন্দরের কারণে ইরানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক গভীর। অন্যদিকে, প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তির জন্য ইসরায়েল ভারতের অন্যতম প্রধান অংশীদার।
১. নিরপেক্ষতার পরীক্ষা: গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার পর থেকে ভারত কার্যত একটি ‘কূটনৈতিক অগ্নিপরীক্ষার’ মুখোমুখি। বন্দর ব্যবহারের অনুমতি না দেওয়াটি একটি স্পষ্ট বার্তা যে, ভারত কোনো পশ্চিমা সামরিক ব্লকের সরাসরি অংশ হতে চায় না।
২. আঞ্চলিক নিরাপত্তা: ভারতের জলসীমার কাছে ইরানি জাহাজে হামলার ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, এই যুদ্ধ কেবল মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ছে। এটি ভারতের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য বড় ঝুঁকি।
৩. তেহরানের ‘অল-আউট’ যুদ্ধ: ইসরায়েলে বারবার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে ইরান প্রমাণ করতে চাইছে যে, তাদের সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর পর তারা কোনো আপস করবে না। এই পরিস্থিতি ভারতকে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকার চেয়েও বেশি আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে ঠেলে দিচ্ছে।
ইসরায়েলের দিকে ধেয়ে আসা প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র এবং নয়াদিল্লির প্রতিটি প্রতিবাদী বিবৃতি প্রমাণ করছে যে, বিশ্ব এক ভয়াবহ মেরুকরণের দিকে এগোচ্ছে। ভারত সরকার স্পষ্ট করে দিয়েছে যে তারা নিজেদের মাটি বা সমুদ্রসীমা কোনো যুদ্ধের লঞ্চপ্যাড হতে দেবে না। তবে সংকটের এই গভীরতা কতদিন নয়াদিল্লিকে নিরপেক্ষ রাখতে পারে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন