মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর প্রধান আমদানি রুট ‘হরমুজ প্রণালী’তে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় পুরো অঞ্চলে এক ভয়াবহ খাদ্য সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথে উত্তেজনার কারণে ব্যাহত হচ্ছে খাদ্যশস্য সরবরাহ। বিশেষ করে ইরানসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর কয়েক কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা এখন বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে।
বিপজ্জনক মাত্রায় আমদানিনির্ভরতা
কমোডিটি অ্যানালিটিকস সংস্থা কেপলার (Kpler)-এর সাম্প্রতিক তথ্যমতে, গত এক বছরে উপসাগরীয় দেশগুলো প্রায় ৩ কোটি টন খাদ্যশস্য আমদানি করেছে। এর মধ্যে এককভাবে ইরানের হিস্যাই ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ টন। এই বিশাল পরিমাণ খাদ্যের সিংহভাগই পরিবাহিত হয় হরমুজ প্রণালী দিয়ে। বর্তমানে এই রুটে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় বিকল্প পথ খুঁজতে হিমশিম খাচ্ছে আমদানিকারক দেশগুলো।
ইরানের বাজারে আগুনের হলকা: মূল্যস্ফীতি ১০৫% ছাড়িয়েছে
সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থায় রয়েছে ইরান। অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট আর বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞার চাপে দেশটিতে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি শেষ হওয়া মাসে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি ১০৫ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ইরান সরকার ইতিমধ্যে সব ধরনের কৃষি পণ্য রপ্তানি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। দেশটির কৃষিমন্ত্রী গোলামরেজা নুরি-ঘেজেলজেহ নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যেন তারা প্রয়োজনের অতিরিক্ত পণ্য মজুত না করেন। কেপলারের বিশ্লেষক ঈশান ভানু সতর্ক করে বলেছেন, "এই অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে ইরান এক ঐতিহাসিক খাদ্য দুর্ভিক্ষের মুখে পড়তে পারে।"
আঞ্চলিক প্রভাব: হুমকিতে ইয়েমেন ও সুদান
নেদারল্যান্ডসের লাইডেন ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক ক্রিশ্চিয়ান হেন্ডারসন বলেন, "এই অঞ্চলে খাদ্য অনিরাপত্তার ঝুঁকি এখন তাৎক্ষণিক বাস্তব। সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে ইয়েমেন, সুদান ও সোমালিয়ার মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত ও দরিদ্র দেশগুলো খাদ্য সংগ্রহ করে। দুবাইয়ের রুটে বিঘ্ন ঘটলে এই দেশগুলো চরম অনাহার ও আকাশচুম্বী দ্রব্যমূল্যের শিকার হবে।"
বিকল্প রুটের সীমাবদ্ধতা ও অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ
সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের বিশাল অর্থনৈতিক সক্ষমতা দিয়ে বাড়তি আমদানির ব্যয় মেটাতে পারলেও কুয়েত, কাতার ও বাহরাইনের মতো দেশগুলো গভীর সংকটে।
কুয়েত ও কাতার: এদের নিজস্ব গভীর সমুদ্রবন্দর না থাকায় এরা সম্পূর্ণভাবে সৌদি আরব ও আমিরাতের ট্রানজিট রুটের ওপর নির্ভরশীল।
ফুজাইরা বন্দর: দুবাইয়ের জেবেল আলী বন্দরের বিকল্প হিসেবে ফুজাইরা বন্দরকে ভাবা হলেও সেখানে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফুজাইরা মূলত জ্বালানি তেল ও সার রপ্তানির জন্য তৈরি, ফলে বিশাল পরিমাণ কন্টেইনার হ্যান্ডেল করার সক্ষমতা এই বন্দরের নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, বিকল্প হিসেবে লোহিত সাগরের বন্দরগুলো ব্যবহারের চেষ্টা করা হলেও তাতে পরিবহন খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যাবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের পকেটে।
এক নজরে বর্তমান সংকট:
বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, হরমুজ প্রণালীর এই রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতা যদি দ্রুত প্রশমিত না হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের খাদ্য সংকট কেবল মুদ্রাস্ফীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা সামাজিক অস্থিরতা ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনেরও কারণ হতে পারে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন