ভয়াল সেই রাতের বর্ণনা ও উদ্ধার অভিযান
প্রত্যক্ষদর্শী ও রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, রাত ৩টার দিকে চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী ‘ঢাকা মেইল’ ট্রেনটি পদুয়ার বাজার রেলক্রসিং অতিক্রম করছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে চুয়াডাঙ্গা থেকে লক্ষ্মীপুরগামী ‘মামুন স্পেশাল’ পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস রেললাইনে উঠে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ট্রেনের গতিবেগ বেশি থাকায় চালক ব্রেক চেপেও সংঘর্ষ এড়াতে পারেননি। সংঘর্ষের তীব্রতায় বাসটি ট্রেনের ইঞ্জিনের সামনে আটকে যায় এবং ট্রেনটি বাসটিকে ঠেলে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে নিয়ে থামে।
নিহতদের পরিচয় ও শোকাতুর পরিবার
রোববার (২২ মার্চ) দুপুরে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিহত ১২ জনের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করেছে। নিহতরা হলেন—নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীর বাবুল চৌধুরী (৫৩), ঝিনাইদহের মহেশপুরের লাইজু আক্তার (২৬) ও তার দুই শিশু কন্যা খাদিজা (৬) ও মরিয়ম (৪), চুয়াডাঙ্গার সোহেল রানা (৪৬), যশোরের সিরাজুল ইসলাম (৬২) ও তার স্ত্রী কোহিনূর বেগম (৫৫), নোয়াখালীর নজরুল ইসলাম (৩৩), লক্ষ্মীপুরের সায়েদা (৯), ঝিনাইদহের জোয়াদ বিশ্বাস (২০), মাগুরার ফচিয়ার রহমান (২৬) এবং চাঁদপুরের তাজুল ইসলাম (৬৮)। একই পরিবারের একাধিক সদস্যের মৃত্যুতে এলাকায় শোকের মাতম চলছে।
কর্তৃপক্ষের তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা ও আর্থিক সহায়তা
দুর্ঘটনার পর রেলওয়ের পক্ষ থেকে প্রাথমিক তদন্তে গাফিলতির প্রমাণ পাওয়ায় দুই গেটম্যান মেহেদী ও হেলালকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় ব্যবস্থাপক (ডিআরএম) মোস্তাফিজুর রহমান ভূঞা জানিয়েছেন, এই ঘটনায় রেলওয়ের পক্ষ থেকে দুটি এবং জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে একটি—মোট তিনটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে নিহতদের পরিবারকে ১ লাখ টাকা করে এবং জেলা প্রশাসন থেকে ২৫ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছেন। এছাড়া আহতদের চিকিৎসার যাবতীয় খরচ সরকার বহন করবে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।
রেল যোগাযোগ ৫ ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর স্বাভাবিক
ভয়াবহ এই দুর্ঘটনার পর চট্টগ্রামের সঙ্গে সারাদেশের রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। দীর্ঘ ৫ ঘণ্টা চেষ্টার পর আখাউড়া থেকে আসা রিলিফ ট্রেন দুর্ঘটনাকবলিত বাস ও ট্রেনটিকে লাইন থেকে সরিয়ে নিলে সকাল ৮টার দিকে রেল চলাচল স্বাভাবিক হয়। এতে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রাম-সিলেট রুটের বেশ কয়েকটি ট্রেন বিভিন্ন স্টেশনে আটকা পড়ে ঈদযাত্রার যাত্রীদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়।
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি দেশের রেলক্রসিং ব্যবস্থার জরাজীর্ণ ও দায়িত্বহীন চিত্রটি আবারও আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। স্থানীয়দের অভিযোগ এবং প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার সময় রেলগেটের সিগন্যালম্যানের চরম অবহেলা ছিল। গেট খোলা থাকায় বাসচালক লাইনে উঠে পড়েন। জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ একাধিকবার ফোন করেও সাড়া না পাওয়া আমাদের প্রশাসনিক দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ।
তদন্ত কমিটি গঠন এবং সাময়িক বরখাস্তই সমাধান নয়; বরং দেশের মহাসড়কের ওপর দিয়ে যাওয়া প্রতিটি রেলক্রসিংকে স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল ব্যবস্থার আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী এবং কৃষিমন্ত্রী দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আধুনিক ব্যবস্থার আশ্বাস দিলেও এর বাস্তবায়ন কত দ্রুত হয়, সেটাই দেখার বিষয়। ঈদ বা উৎসবের সময় যখন যানবাহনের চাপ বাড়ে, তখন গেটম্যানদের বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন ছিল। সড়ক ও রেলপথে সমন্বয়ের অভাব এবং যথাযথ তদারকির ঘাটতি থাকলে সাধারণ মানুষের এই ‘অকাল মৃত্যু’ কোনোভাবেই বন্ধ করা সম্ভব নয়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন