আজ ১৬ই ডিসেম্বর, মহান বিজয় দিবস। দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার শ্রেষ্ঠতম অর্জন লাভ করে। জাতি আজ যথাযোগ্য মর্যাদা ও গভীর শ্রদ্ধায় দিবসটি উদযাপন করছে। সকালে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টার শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যমে দিনের কর্মসূচির সূচনা হয়।
পৌষের মিষ্টি রোদে উদ্ভাসিত প্রকৃতিতে আজ বইছে আনন্দধারা। ফসলের প্রাচুর্যের সাথে বিজয়ের গল্প যেন একসূত্রে গাঁথা। একাত্তরের এমনই এক দিনে বাংলাদেশ স্পর্শ করেছিল মুক্তির মাইলফলক। বিজয়ের ৫৫ বছরে নতুন প্রজন্মের প্রত্যয় সাম্য প্রতিষ্ঠার ইশতেহার নিয়ে এগিয়ে যাওয়া। আর অগ্রজদের প্রত্যাশা—রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থার আধিপত্যবাদ দূর করে সম্মিলিতভাবে গড়ে উঠবে নতুন বাংলাদেশ।
গণঅভ্যুত্থানের পর ভিন্ন প্রেক্ষাপট
এবারের বিজয় উদযাপনে বিশেষ স্থান পাচ্ছেন ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শহীদরা। গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর নতুন গণতান্ত্রিক, মানবিক ও বৈষম্যহীন এক মাতৃভূমি গড়ার প্রত্যাশা দেশের আপামর মানুষের মধ্যে বিদ্যমান।
প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস তার বিজয় দিবসের বাণীতে বলেন, "গত ১৬ বছর ধরে পক্ষ-বিপক্ষ সৃষ্টি করে ঔপনিবেশিক ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতির মাধ্যমে দেশকে বিভাজিত করে বাংলাদেশকে লুটেপুটে খেয়েছে গণহত্যাকারী আওয়ামী লীগ। এই বিভাজনকে সহ্য করতে পারেনি দেশের মানুষ। ফলে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ফের শুরু হয় লড়াই-সংগ্রাম। অবশেষে ’৭১ এর রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে এক নতুন বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়।"
মুক্তিযুদ্ধের সূচনা ও আত্মত্যাগ
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে এ দেশের ঘুমন্ত নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের ওপর ট্যাংক-কামানের মতো ভয়ঙ্কর মারণাস্ত্র নিয়ে গণহত্যার পৈশাচিকতায় মেতে উঠলে শুরু হয়েছিল প্রতিরোধ সংগ্রাম। সেই রাতেই তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের ঘোষণায় দেশের স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন দেশের ছাত্র, শিক্ষক, শ্রমিক, কৃষকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। তাদের কোনো যুদ্ধের প্রশিক্ষণ বা উন্নত সমরাস্ত্র ছিল না। জীবনের মায়া তুচ্ছ করে বীর সন্তানেরা শত্রুর মোকাবিলায় মরণপণ লড়েছিলেন।
দীর্ঘ ৯ মাস ধরে চলা এই যুদ্ধে ৩০ লাখ মানুষের প্রাণ, দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম এবং বিপুল সম্পদহানির মধ্য দিয়ে ১৬ই ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। ছিনিয়ে আনা হয় একটি স্বাধীন ভূখণ্ড ও লাল-সবুজের পতাকা। জাতি আজ এই বিজয়ের দিনে গভীর কৃতজ্ঞতা ও পরম শ্রদ্ধায় জীবন উৎসর্গকারী বীর সন্তানদের স্মরণ করছে।
নেতৃবৃন্দের বার্তা ও গণতন্ত্রের আহ্বান
প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিন তার বাণীতে বলেছেন, "১৬ ডিসেম্বর, মহান বিজয় দিবস। এ দিনটি আমাদের জাতীয় গৌরবের প্রতীক, স্বাধীনতার চূড়ান্ত সাফল্যের স্মারক। স্বাধীনতার প্রকৃত সুফল জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হলে গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পরমতসহিষ্ণুতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং ঐক্যের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।"
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান তার শুভেচ্ছা বার্তায় উল্লেখ করেন, "১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ডাকে শুরু হওয়া স্বাধীনতা যুদ্ধ ওই বছর ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জিত হয় পাক হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করার মাধ্যমে। দেশের অদম্য বীর মুক্তিযোদ্ধারা জীবন বাজি রেখে এ বিজয় ছিনিয়ে আনে। তাই ১৬ ডিসেম্বর জাতির অহঙ্কার, আনন্দ আর বেদনার এক মহাকাব্যিক দিন।"
এ ছাড়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলও দিবসটি উপলক্ষে শুভেচ্ছা বার্তা দিয়েছে।
জাতীয় স্মৃতিসৌধ প্রস্তুত, কড়া নিরাপত্তা
সেলিম আহমেদ, সাভার থেকে: মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে জাতির বীর সন্তানদের শ্রদ্ধা জানাতে প্রস্তুত করা হয়েছে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ। গণপূর্ত অধিদপ্তর নানা প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। রং তুলির আঁচড়ে স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণকে বাহারী ফুলের গাছ ও টব দিয়ে লাল-সবুজে সাজানো হয়েছে।
জাতীয় স্মৃতিসৌধের গণপূর্ত বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী আনোয়ার খান আনু বলেন, আলোকসজ্জা, লেক সংস্কার এবং শহীদ বেদী সম্পূর্ণ প্রস্তুত করা হয়েছে।
দিবসটির প্রথম প্রহরে প্রেসিডেন্ট, প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা পরিষদ, তিন বাহিনীর প্রধান, বিদেশি কূটনৈতিক, মুক্তিযোদ্ধাসহ লাখো মানুষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন।
ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক জানান, আমিনবাজার থেকে জাতীয় স্মৃতিসৌধ পর্যন্ত পুলিশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। চার হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়ন করা হয়েছে এবং সাদা পোশাকে পুলিশ সদস্যরা টহলরত অবস্থায় রয়েছে। বিদেশি কূটনৈতিক মিশনের আশপাশেও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
দেশজুড়ে কর্মসূচি
দেশের সব সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে এবং রাতে গুরুত্বপূর্ণ ভবন ও স্থাপনা আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হবে। দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরে সংবাদপত্রগুলো প্রকাশ করেছে বিশেষ ক্রোড়পত্র। ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলো প্রচার করছে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বিভিন্ন অনুষ্ঠান। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দেশের শান্তি, সমৃদ্ধি ও অগ্রগতি কামনা করে বিশেষ দোয়া ও উপাসনার আয়োজন করা হয়েছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন