ঢাকা আজ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ মহানগরী। প্রায় দুই কোটিরও বেশি মানুষের আবাসস্থল এই শহর প্রতিদিনই নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। যানজট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ড্রেনেজ সমস্যা, পানি জমে থাকা, রাস্তার ভাঙাচোরা অবস্থা, অগ্নি-নিরাপত্তার ঘাটতি থেকে শুরু করে জনস্বাস্থ্য রক্ষার বিষয়গুলোতেও নাগরিকরা নিত্য ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। এ সবকিছুই সরাসরি সম্পর্কিত ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব ও কর্তব্যের সঙ্গে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, নাগরিক সেবার নামে প্রতিশ্রুতি যতটা শোনা যায়, বাস্তবে তার কার্যকর রূপ ততটাই সীমিত।
করপোরেশনের প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য
ঢাকা সিটি করপোরেশনের প্রধান কর্তব্য হচ্ছে নাগরিক জীবনকে সহজ, সুন্দর ও স্বাস্থ্যসম্মত করে তোলা। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: শহরের ঘরবাড়ি, বাজার, হাসপাতাল ও শিল্প-কারখানা থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার টন বর্জ্য সংগ্রহ ও সঠিকভাবে নিষ্পত্তি করা।
সড়ক ও ড্রেনেজ রক্ষণাবেক্ষণ: রাস্তাঘাট নিয়মিত সংস্কার, ভাঙা অংশ মেরামত এবং ড্রেন পরিষ্কার রাখা যাতে অল্প বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা তৈরি না হয়।
নগর পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যসেবা: নিয়মিত রাস্তা ঝাড়ু দেওয়া, মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা, প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র চালু রাখা।
নগর পরিকল্পনা ও উন্নয়ন: খেলার মাঠ, পার্ক, ফুটপাত ও জনসাধারণের চলাচলের জায়গা রক্ষা করা, অবৈধ দখলমুক্ত রাখা।
আলো ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা: সড়কে পর্যাপ্ত লাইট স্থাপন, অগ্নি-ঝুঁকিপূর্ণ বাজার ও ভবন পরিদর্শন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
দায়িত্ব অবহেলার চিত্র
বাস্তবে দেখা যায়, এই দায়িত্বগুলোর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সিটি করপোরেশনের গাফিলতি স্পষ্ট। বর্ষাকালে সামান্য বৃষ্টিতেই রাজধানীর রাস্তায় হাঁটু সমান পানি জমে যায়। এটি শুধু নাগরিক দুর্ভোগই বাড়ায় না, বরং যানজট ও অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও একই চিত্র। নিয়মিত ময়লা-আবর্জনা না তোলায় অনেক জায়গায় দুর্গন্ধে পরিবেশ দূষিত হয়, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। অনেক হাসপাতালের বায়োমেডিক্যাল বর্জ্যও খোলা স্থানে ফেলা হয়।
রাস্তার অবস্থা একইভাবে করুণ। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে থাকে মাসের পর মাস। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—এত কর ও ভ্যাট দেওয়ার পরও কেন এই মৌলিক সেবা মিলছে না?
এছাড়া মশক নিধন কর্মসূচি কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে তার কার্যকারিতা প্রায় নেই বললেই চলে। ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার মতো প্রাণঘাতী রোগ প্রতিবছর হাজারো মানুষকে আক্রান্ত করছে, অনেকের প্রাণ যাচ্ছে, অথচ করপোরেশনের উদ্যোগ থাকে মৌসুমভিত্তিক ও সীমিত।
দায় এড়ানোর প্রবণতা
প্রতিবার সমস্যা দেখা দিলে কর্তৃপক্ষ দায় এড়ানোর প্রবণতা দেখায়। যেমন—জলাবদ্ধতার দায় চাপানো হয় ওয়াসার ওপর, আবার মশার প্রজননের দায় দেয়া হয় আবাসিক এলাকার খালি প্লটে। অথচ নাগরিকদের কাছে সিটি করপোরেশনই হচ্ছে প্রধান সেবাদানকারী সংস্থা। সমন্বয়হীনতা, পরিকল্পনার অভাব ও দুর্নীতি মিলেই এই অব্যবস্থাপনার জন্ম দিচ্ছে।
নাগরিক প্রত্যাশা ও করণীয়
নাগরিকরা চান কার্যকর সেবা। তারা যে করপোরেশন ট্যাক্স দেন, তার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত রাস্তা মেরামত, ড্রেন পরিষ্কার, ময়লা অপসারণ, মশক নিধন—এসবকে নিয়মিত কার্যক্রমে পরিণত করতে হবে। একই সঙ্গে নগর উন্নয়ন পরিকল্পনায় স্বচ্ছতা আনতে হবে এবং জনগণের কাছে জবাবদিহিতা বাড়াতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, করপোরেশনের প্রতিটি কাজে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। সাময়িক উদ্যোগে সমস্যা মেটে না। জলাবদ্ধতা নিরসনে আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় পূর্ণকালীন কর্মসূচি চালু করা জরুরি।
উপসংহার
ঢাকা কেবল বাংলাদেশ নয়, দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ একটি নগরী। অথচ সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে করপোরেশনের দায়িত্ব অবহেলা দিন দিন নাগরিকদের অসহায় করে তুলছে। দায়িত্ব এড়িয়ে চলার মানসিকতা বাদ দিয়ে প্রকৃত অর্থে নাগরিকবান্ধব করপোরেশন গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় ঢাকা মহানগর শুধু অনিয়ম, দুর্ভোগ ও রোগব্যাধির শহর হিসেবেই পরিচিত হয়ে থাকবে।
- মোঃ ফারুক মিল্টন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন