আন্তর্জাতিক ডেস্ক | বিডি নিউজ সত্যকথা
![]() |
নতুন সরকারি নিয়মের জেরে পশুর হাটে গরুর বয়স ও নথিপত্র পরীক্ষা করছেন সংশ্লিষ্টরা। ছবি: প্রতীকী। |
১৪ বছরের আইনি কড়াকড়ি ও ‘বার্থ সার্টিফিকেট’ বিতর্ক
ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই নতুন বিজেপি সরকার ১৯৫০ সালের একটি পুরনো ‘প্রাণিসম্পদ সংরক্ষণ আইন’ কঠোরভাবে কার্যকর করার ঘোষণা দিয়েছে। নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, ১৪ বছরের কম বয়সী কোনো গরু বা মহিষ জবাই করা যাবে না। একই সাথে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় বা হাটে পশু পরিবহনের জন্য স্থানীয় প্রশাসন কিংবা রাজ্য প্রাণিসম্পদ বিভাগের লিখিত পূর্বানুমতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
এই নিয়ম মাঠপর্যায়ে কার্যকর করতে গিয়ে রাজ্যটির বিভিন্ন স্থানে চরমপন্থী ও অদ্ভুত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। উত্তর ২৪ পরগনার হিঙ্গলগঞ্জ ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড়ের মতো এলাকাগুলোতে বিজেপি বিধায়ক ও উগ্র কর্মীদের নেতৃত্বে পশুবাহী গাড়ি থামিয়ে গরুর বয়স প্রমাণ করার নথিপত্র বা অদ্ভুতভাবে গরুর ‘বার্থ সার্টিফিকেট’ (জন্মনিবন্ধন সনদ) দাবি করা হচ্ছে! সঠিক নথিপত্র দেখাতে না পারলে বা বয়স নিয়ে সামান্য সন্দেহ হলেই পশুগুলোকে জোরপূর্বক আটকে দেওয়া হচ্ছে এবং ব্যবসায়ীদের হেনস্থা করা হচ্ছে।
ভাঙড়ের ঘোষপাড়ার খামারিদের প্রশ্ন, "মানুষের জন্ম নিবন্ধন বা সার্টিফিকেট থাকলেও, একটি গরুর জন্ম সার্টিফিকেট খামারিরা কোথা থেকে সংগ্রহ করবেন? তাছাড়া বর্তমান সময়ে আধুনিক প্রযুক্তির কারণে লাঙল দিয়ে চাষের প্রচলন না থাকায়, কোনো চাষী বা খামারি ৮-৯ বছরের বেশি বয়সের বুড়ো গরু সাধারণত খামারে পালন করেন না। তাহলে ১৪ বছর বয়স আমরা কোথায় পাব?"
মাথায় হাত ঘোষপাড়ার হিন্দু খামারিদের: ঋণের বোঝা ও অনাহার
পশ্চিমবঙ্গে কুরবানির গরু মোটাতাজাকরণ ও পালনের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত সিংহভাগ পরিবারই হিন্দু সম্প্রদায়ের—বিশেষ করে ঘোষ ও গোপ সম্প্রদায়ের মানুষ। তারা কম দামে বাছুর বা গরু কিনে সারা বছর লালন-পালন করেন এবং ঈদের সময় মুসলিম ক্রেতাদের কাছে ভালো দামে বিক্রি করেন। এই বিক্রির টাকা দিয়েই চলে তাদের সারা বছরের সংসার— ছেলেমেয়ের পড়াশোনা, বিয়ে, চিকিৎসা ও ঘর সংস্কার।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড়ের এমনই একজন সনাতন ধর্মাবলম্বী গরু ব্যবসায়ী সোনালি ঘোষ। তার কণ্ঠে এখন স্পষ্ট ভবিষ্যৎ হারানোর হতাশা ও তীব্র ক্ষোভ। সোনালি ঘোষ বলেন, "সমস্ত জমি-জায়গা বন্ধক রেখে, গলার সোনা বন্ধক দিয়ে ব্যাংক ও স্থানীয় মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে এই ব্যবসা চালাই। এবার গরু বিক্রি না হলে ঋণ শোধ করব কিভাবে? নিজেরাই বা খাব কী? যারা গরু কিনে অগ্রিম বা বায়না করেছিলেন, তারা এখন পুলিশি ঝামেলা ও গাড়ি আটকে দেওয়ার ভয়ে বায়নার টাকা ফেরত চাচ্ছেন। গরু বিক্রির টাকা তো আগের ভুসি-খড়ের দেনা মেটাতেই খরচ হয়ে গেছে, এখন ফেরত দেব কী করে?"
আরেক নারী ব্যবসায়ী সরস্বতী ঘোষ কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেন, "সরকার অন্তত এবারটার জন্য ছাড় দিত! আমরা তো নিয়ম জানতাম না। এই ঈদটা পার হলে আমরা ব্যবসা ছেড়ে দিতাম। আমাদের ওপর যে ব্যাংকের ঋণ আছে, সরকার সেটা মওকুফ করে দিক।" গোবিন্দ মল্লিকের মতো অনেকেই ধার-দেনায় ব্যবসা চালাতেন, যারা এখন টাকা ডুবে যাওয়ার আশঙ্কায় দিশেহারা। খামারে পশুগুলোকে ঠিকমতো খাবার দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ভুসি ও খড়ের দোকানে লাখ লাখ টাকা বাকি পড়ে থাকায় বিক্রেতারা আর নতুন করে বাকিতে খাবার দিচ্ছেন না। ফলে দ্রুত সমাধান না হলে গবাদি পশুগুলো খামারেই অনাহারে মারা যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
মুসলিম নেতাদের ‘কুরবানি বয়কট’ ডাক: উল্টো বিপাকে বিজেপি
এই চরম উসকানিমূলক ও কড়াকড়ির পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গের অনেক শীর্ষ মুসলিম ধর্মীয় নেতা এক কৌশলগত অবস্থান নিয়েছেন, যা বিজেপির রাজনৈতিক সমীকরণকে ওলটপালট করে দিয়েছে। কলকাতার বিখ্যাত নাখোদা মসজিদের ইমাম মাওলানা মোহাম্মদ শফিক কাসেমি এক বিবৃতিতে বলেছেন, "আইনি জটিলতার কারণে দয়া করে এবার কেউ গরু কুরবানি করবেন না। গরুর মাংসও খাবেন না।" ফুরফুরা শরিফের পীরজাদা ত্বহা সিদ্দিকীও একই ধরনের সামাজিক আহ্বান জানিয়েছেন।
তাদের যুক্তি অত্যন্ত পরিষ্কার— গরু বিক্রেতা ও খামারিরা মূলত হিন্দু সম্প্রদায়ের ভাই-বোন। মুসলমানরা যদি এবার আইনি ভীতি ও ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষার্থে গরু কেনা পুরোপুরি বয়কট করে ছাগল বা ভেড়া কুরবানি দেয়, তবে সবচেয়ে বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন এই সমস্ত দরিদ্র হিন্দু খামারিরাই। রাজ্যের কিছু মুসলিম এলাকায় ইতিমধ্যেই 'গরু কুরবানি বয়কট, আইন সবার উপরে' স্লোগানে মিছিলও হয়েছে। গ্রামীণ বাসিন্দারা বলছেন, বিজেপি মুসলমানদের টাইট দিতে গিয়ে নিজেদের হিন্দু ভাইদেরকেই আত্মহননের পথে ঠেলে দিয়েছে। তবে এর বিপরীতে আম জনতা উন্নয়ন পার্টির হুমায়ুন কবীরসহ কয়েকজন নেতা হুঙ্কার দিয়ে বলছেন, "গরু-ছাগল কুরবানি হবেই। আগুন নিয়ে খেলবেন না।"
ধস নেমেছে মাংসের বাজারে, নবান্ন অভিযানের হুঁশিয়ারি
হঠাৎ এই নিষেধাজ্ঞার কারণে পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী পশুর হাটগুলো এখন সম্পূর্ণ ক্রেতাহীন। বাজারে গরুর মাংসের সরবরাহ ব্যাপক কমে যাওয়ায় এবং তীব্র আতঙ্কের কারণে জীবিত গরুর দাম কেজিপ্রতি ৪০০ রুপি (প্রায় ৫ ডলার) থেকে নাটকীয়ভাবে নেমে মাত্র ১৫০ রুপিতে (১.৭০ ডলার) এসে ঠেকেছে। ব্যবসায়িক মন্দার প্রভাব পড়েছে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী রেস্তোরাঁ ও মাংসের দোকানগুলোতেও। বহু মুসলিম মাংস ব্যবসায়ী গত ৬০ বছর ধরে সরকারি লাইসেন্স নিয়ে বৈধ ব্যবসা করলেও এখন বজরং দল ও গো-রক্ষকদের আতঙ্কে দোকান বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গে কুরবানির গরুর বাজার প্রায় কয়েক হাজার কোটি টাকার। শুধু খামারি নয়, গরুর খড়-ভুসি সরবরাহকারী, পশু চিকিৎসক, চামড়া ব্যবসায়ী, ছুরি-বটি তৈরির কারিগর— এই চেইনের সঙ্গে জড়িত লাখ লাখ দরিদ্র পরিবারের জীবিকা এখন চরম সংকটে। ঘোষপাড়ার খামারিরা সাফ জানিয়েছেন, কুরবানির পশু বেচাকেনা নিয়ে তাদের মধ্যে কখনোই কোনো সাম্প্রদায়িক বিবাদ ছিল না। যদি এই ধরনের কোনো নিয়ম বা নিষেধাজ্ঞা জারি করতেই হতো, তবে অন্তত ৬ মাস বা এক বছর আগে তাদের জানানো উচিত ছিল। খামারিদের দাবি, সরকার যেন ধানের মতো খামারিদের কাছ থেকে ন্যায্য মূল্যে এই সমস্ত গরু কিনে নেয় অথবা এই বছরের জন্য নিয়মটি শিথিল করে। অন্যথায় গবাদি পশু নিয়ে রাজ্য সরকারের সদর দফতর 'নবান্ন' অভিমুখে বিশাল আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন