সত্যকথা রিপোর্ট
করোনা মহামারীর পরবর্তী সময় থেকে দেশের শিক্ষাপঞ্জিতে যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠতে আপ্রাণ চেষ্টা করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। শিক্ষামন্ত্রী জানান, ডিসেম্বরে পরীক্ষা নেওয়ার একটি প্রাথমিক পরিকল্পনা থাকলেও শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের বাস্তব সমস্যার কথা বিবেচনা করে সরকার সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে। তিনি বলেন, “আমরা চাই না আমাদের কোনো সিদ্ধান্তের কারণে শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত মানসিক চাপ সৃষ্টি হোক বা তাদের শিখন ঘাটতি থেকে যাক। ধাপে ধাপে আমরা শিক্ষাসূচিকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনব।”
কেন ডিসেম্বরে পরীক্ষা নয়?
আজ সকালেই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে বিশেষজ্ঞ, শিক্ষক এবং অভিভাবকদের নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে অধিকাংশ অংশগ্রহণকারীই ডিসেম্বরে পরীক্ষা নেওয়ার বিরোধিতা করেন। তাদের যুক্তি ছিল, যদি চলতি বছর বা হুট করে আগামী বছর ডিসেম্বরে পরীক্ষা নেওয়া হয়, তবে শিক্ষার্থীরা প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত সময় পাবে না। বিশেষ করে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তাদের একাদশ শ্রেণির ক্লাস শুরু হয়েছিল অনেক দেরিতে। ফলে ডিসেম্বরে পরীক্ষা নিলে পাঠ্যসূচি শেষ করা অসম্ভব হয়ে পড়ত। অনলাইন সভায় যুক্ত হওয়া এক শিক্ষার্থী স্পষ্টভাবে জানায়, সময়ের এই ঘাটতি তাদের রেজাল্টের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলত। এসব দিক বিবেচনা করেই সরকার জানুয়ারির শেষ ভাগে এসএসসি এবং জুন মাসে এইচএসসি নেওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সেশনজট মুক্ত করার পরিকল্পনা
শিক্ষামন্ত্রী শুধু মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক নয়, উচ্চশিক্ষার সেশনজট নিয়েও কথা বলেন। তিনি জানান, দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ক্যালেন্ডার ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় এখন থেকে ‘সিংক্রোনাইজেশন’ বা সমন্বয়ের ওপর জোর দিচ্ছে যাতে নীতিনির্ধারকদের ভুলের কারণে কোনো শিক্ষার্থীর জীবন থেকে মূল্যবান সময় নষ্ট না হয়। আইইউটি-র অনুষ্ঠানে মন্ত্রী বলেন, “অতীতের শিক্ষাক্ষেত্রে যে অব্যবস্থাপনা ছিল, তা দূর করতে আমরা কাজ করছি। লক্ষ্য একটাই—শিক্ষাবর্ষকে একটি সুশৃঙ্খল কাঠামোর মধ্যে ফিরিয়ে আনা।”
পরীক্ষার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি
উল্লেখ্য যে, স্বাভাবিক সময়ে এসএসসি পরীক্ষা ফেব্রুয়ারি এবং এইচএসসি পরীক্ষা এপ্রিল মাসে অনুষ্ঠিত হতো। কিন্তু করোনার ধাক্কায় এই সূচি ওলটপালট হয়ে যায়। চলতি ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষা শুরু হয়েছে গত ২১ এপ্রিল এবং এইচএসসি হওয়ার কথা রয়েছে জুলাই মাসে। মন্ত্রী জানান, ২০২৭ সালের সূচিটি হবে সেশনজট থেকে মুক্তির প্রথম ধাপ। পরবর্তী বছরগুলোতে ধীরে ধীরে সময় আরও কমিয়ে এনে পুনরায় ফেব্রুয়ারি-এপ্রিলের স্বাভাবিক সূচিতে ফেরার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
আইইউটি-র অনুষ্ঠানে উৎসবমুখর পরিবেশ
গাজীপুরের আইইউটি ক্যাম্পাসে আয়োজিত ‘শ্রেষ্ঠত্ব’ পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপ-উপাচার্য ড. হিসাইন আরাবি নূরসহ বিভিন্ন বিভাগের প্রধানগণ। অনুষ্ঠানে মেধাবী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের হাতে সম্মাননা ও সার্টিফিকেট তুলে দেন মন্ত্রী। মন্ত্রীর এই ঘোষণার পর অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে স্বস্তির নিঃশ্বাস লক্ষ্য করা যায়।
বিডি নিউজ সত্যকথা বিশ্লেষণ
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই সিদ্ধান্তকে আমরা একটি ‘বাস্তববাদী ও সংবেদনশীল’ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছি। শিক্ষাব্যবস্থাকে শৃঙ্খলায় ফেরানো যেমন জরুরি, তার চেয়েও বেশি জরুরি শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য এবং সঠিক মূল্যায়নের সুযোগ দেওয়া। হুট করে চার মাস সময় কমিয়ে ডিসেম্বরে পরীক্ষা নিলে কয়েক লাখ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে পড়ত।
তবে একটি বিষয় নজরে রাখা দরকার, পরীক্ষার সূচি এগিয়ে আনার পাশাপাশি সিলেবাস এবং পাঠদান পদ্ধতির মধ্যেও সমন্বয় প্রয়োজন। শুধু পরীক্ষার তারিখ পরিবর্তন করলেই হবে না, ক্লাসরুমে কার্যকর শিখন নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় যে ‘অভিন্ন প্রশ্নপত্র’ বা বিষয় কমানোর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে, তা যেন দ্রুত বাস্তবায়িত হয়। বিডি নিউজ সত্যকথা মনে করে, শিক্ষামন্ত্রীর এই ঘোষণা তৃণমূল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করবে।
আরও পড়ুন: অবশেষে আলোর মুখ দেখছে বিশাল ‘পদ্মা ব্যারাজ’ প্রকল্প
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন