স্পোর্টস ডেস্ক । বিডি নিউজ সত্যকথা
পঞ্চম দিনের চা-বিরতি পর্যন্ত ম্যাচটি ছিল সমানে সমান। পাকিস্তানের প্রয়োজন ছিল ১৫২ রান, হাতে ৭ উইকেট। ক্রিজে থিতু হওয়া অভিষিক্ত আব্দুল্লাহ ফজল এবং অধিনায়ক সালমান আগা চোখ রাঙাচ্ছিলেন টাইগারদের। কিন্তু বিরতির পরেই দৃশ্যপট বদলে দেন নাহিদ রানা। গ্যালারিতে উপস্থিত হাজার দুয়েক দর্শক তখন সমস্বরে চিৎকার করছেন— ‘নাহিদ... নাহিদ...’। সেই চিৎকারে যেন আরও উজ্জীবিত হয়ে ওঠেন এই ডানহাতি পেসার।
নিজের করা টানা দুই ওভারে তিনি ফিরিয়ে দেন সাউদ শাকিল ও অভিজ্ঞ মোহাম্মদ রিজওয়ানকে। ১৪৭.২ কিলোমিটার গতির এক বিষাক্ত রিভার্স সুইংয়ে রিজওয়ান যখন বোল্ড হলেন, মিরপুর ইনডোর স্টেডিয়ামের গগনবিদারী চিৎকারে চারপাশ প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। নাহিদ রানা এদিন ৪৭ রান খরচায় ৫ উইকেট শিকার করেন, যা তার ক্যারিয়ার সেরা বোলিং। টেস্ট ক্রিকেটের ২৬ বছরের ইতিহাসে প্রথম বাংলাদেশি পেসার হিসেবে চতুর্থ ইনিংসে ৫ উইকেট নেওয়ার অনন্য রেকর্ড গড়লেন তিনি।
শান্তর অধিনায়কোচিত ইনিংস ও জয়ের ভিত
জয়ের টার্গেট সেট করার পেছনে বড় ভূমিকা ছিল অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর। প্রথম ইনিংসে সেঞ্চুরি করা শান্ত দ্বিতীয় ইনিংসেও খেলছিলেন অতিমানবীয়ভাবে। যদিও মাত্র ১৩ রানের জন্য জোড়া সেঞ্চুরি মিস করেছেন তিনি (৮৭ রান), তবে তার এই ইনিংসই পাকিস্তানকে ২৬৮ রানের চ্যালেঞ্জিং টার্গেট দিতে সাহায্য করে। তাকে যোগ্য সঙ্গ দেন মুমিনুল হক (৫৬) এবং শেষ দিকে মেহেদী হাসান মিরাজ (২৪)। বাংলাদেশ ৯ উইকেটে ২৪০ রানে ইনিংস ঘোষণা করলে পাকিস্তানের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় ২৬৮।
শুরুতেই তাসকিনের আঘাত ও পাকিস্তানের প্রতিরোধ
জয়ের লক্ষ্যে ব্যাটিংয়ে নেমে শুরুতেই হোঁচট খায় পাকিস্তান। ইনিংসের প্রথম ওভারেই তাসকিন আহমেদ সাজঘরে ফেরান ওপেনার ইমাম-উল-হককে। এরপর আজান আওয়াইস (১৫) এবং শান মাসুদ (২) দ্রুত বিদায় নিলে পাকিস্তান চাপে পড়ে। তবে চতুর্থ উইকেটে আব্দুল্লাহ ফজল এবং সালমান আগা ৫১ রানের জুটি গড়ে প্রতিরোধের চেষ্টা করেন। অভিষিক্ত ফজল ৬৬ রানের এক লড়াকু ইনিংস খেলে তাইজুল ইসলামের ঘূর্ণিতে এলবিডব্লিউর শিকার হন। এরপরই শুরু হয় নাহিদ রানার সেই ‘ম্যাজিকাল স্পেল’।
পরিসংখ্যানের পাতায় বাংলাদেশের আধিপত্য
পাকিস্তানের বিপক্ষে এটি বাংলাদেশের টানা তৃতীয় টেস্ট জয়। ২০২৪ সালে পাকিস্তানের মাটিতে তাদের হোয়াইটওয়াশ করে আসার পর এবার দেশের মাটিতেও জয়ের ধারা বজায় রাখল টাইগাররা। পাকিস্তানের শেষ ৫ উইকেটের পতন ঘটে মাত্র ১১ রানে, যার কারিগর ছিলেন নাহিদ রানা। তাকে যোগ্য সহায়তা দিয়েছেন তাসকিন (২ উইকেট) এবং তাইজুল (২ উইকেট)।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
বাংলাদেশ: ৪১৩ ও ২৪০/৯ ডি. (শান্ত ৮৭, মুমিনুল ৫৬, মিরাজ ২৪, মুশফিক ২২; হাসান ৩/৫২, নোমান ৩/৭৬)।
পাকিস্তান: ৩৮৬ ও ১৬৩ (লক্ষ্য ২৬৮) (ফজল ৬৬, সালমান ২৬, শাকিল ১৫, রিজওয়ান ১৫; নাহিদ রানা ৫/৪০, তাইজুল ২/২২, তাসকিন ২/৪০)।
ফল: বাংলাদেশ ১০৪ রানে জয়ী।
সিরিজ: দুই ম্যাচ সিরিজে বাংলাদেশ ১-০তে এগিয়ে।
ম্যাচ সেরা: নাজমুল হোসেন শান্ত।
বিডি নিউজ সত্যকথা বিশ্লেষণ
মিরপুরের এই জয়টি কেবল একটি ম্যাচ জয় নয়, বরং বাংলাদেশের পেস বোলিং বিপ্লবের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। একসময় বাংলাদেশ দল স্পিন নির্ভর থাকলেও এখন তাসকিন-নাহিদ-ইবাদতদের পেস আক্রমণ বিশ্বমানের হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে নাহিদ রানার যে গতি এবং রিভার্স সুইং নিয়ন্ত্রণ, তা টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
তবে ফিল্ডিংয়ে আরও উন্নতি করার জায়গা আছে টাইগারদের। রিজওয়ানের বিরুদ্ধে তাসকিনের এলবিডব্লিউ আপিল রিভিউতে না টেকায় কিছু সময়ের জন্য উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। নির্বাচকদের সাহসী সিদ্ধান্তের সুফল হিসেবে নাহিদ রানার মতো প্রতিভার বিকাশ ঘটছে, যা দেশের ক্রিকেটের জন্য দীর্ঘমেয়াদী সুসংবাদ।
আরও পড়ুন: ঘরে বসেই মিলবে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ‘ই-ঋণ’: ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈপ্লবিক পদক্ষেপ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন