![]() |
| দীর্ঘ সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের সাময়িক যুদ্ধবিরতির একটি প্রতীকী চিত্র। |
ট্রাম্পের ঘোষণা ও হরমুজ প্রণালির শর্ত
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার পোস্টে জানান, বুধবার রাতে ইরানের ওপর যে বিধ্বংসী ও ভয়াবহ হামলা চালানোর পরিকল্পনা ছিল, তা আপাতত ১৪ দিনের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। তবে এই স্থগিতাদেশের প্রধান শর্ত হলো— ইরানকে অবিলম্বে এবং সম্পূর্ণ নিরাপদভাবে ‘হরমুজ প্রণালি’ আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে। ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই তাদের অধিকাংশ সামরিক লক্ষ্য অর্জন করেছে এবং ইরানের সঙ্গে একটি দীর্ঘমেয়াদী শান্তি চুক্তির পথে অনেক দূর এগিয়েছে।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট এই যুদ্ধবিরতিকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘বিরাট বিজয়’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, “আমাদের সামরিক বাহিনীর সাফল্য সর্বোচ্চ দরকষাকষির সুযোগ তৈরি করেছিল, যা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে একটি কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুলে দিতে সক্ষম করেছে।”
ইরানের ১০ দফা শান্তি প্রস্তাব
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ও ফারস নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী, তেহরান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে একটি ১০ দফার বিস্তারিত শান্তি পরিকল্পনা পেশ করেছে। এই প্রস্তাবটি পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনে পৌঁছানো হয়েছে। এই ১০ দফার মধ্যে প্রধান শর্তগুলো হলো:
১. ইরানের ওপর থেকে সব ধরনের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার।
২. হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের সার্বভৌমত্ব ও একক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা।
৩. মধ্যপ্রাচ্য থেকে সব মার্কিন যুদ্ধসেনা প্রত্যাহার।
৪. ইরান ও তার মিত্রদের ওপর সব ধরনের হামলা স্থায়ীভাবে বন্ধ করা।
৫. বিদেশে হিমায়িত ইরানের সব সম্পদ অবমুক্ত করা।
৬. পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার অঙ্গীকারের বিনিময়ে দেশীয় প্রযুক্তিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার বজায় রাখা।
৭. বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে প্রায় ২০ লাখ ডলার 'ট্রানজিট ফি' আদায় করে ওমানের সাথে ভাগ করে নেওয়া।
৮. যুদ্ধের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে বিশেষ আর্থিক তহবিল গঠন।
৯. আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে বহুপাক্ষিক শান্তি চুক্তি সম্পাদন।
১০. যেকোনো চুক্তিকে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বাধ্যতামূলক করতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে রেজল্যুশন পাস।
তেহরানের প্রতিক্রিয়া: ‘আঙুল এখনো ট্রিগারে’
সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও নিজেদের কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল। এক বিবৃতিতে তারা জানিয়েছে, ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির অনুমোদনের ভিত্তিতে এই চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। তবে তারা সতর্ক করে বলেছে, “আমাদের আঙুল এখনো ট্রিগারে রয়েছে; শত্রুর পক্ষ থেকে সামান্যতম ভুল হওয়া মাত্রই পূর্ণ শক্তি দিয়ে তার জবাব দেওয়া হবে।” ইরানের সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে আয়াতুল্লাহ খামেনির ছবি হাতে নিয়ে এই সমঝোতাকে ‘বিরাট বিজয়’ হিসেবে উদ্যাপন করছে।
ইসরায়েলের ভিন্ন সুর: লেবাননে হামলা চলবে
ইসলামাবাদ বৈঠকের দিকে তাকিয়ে বিশ্ব
আগামী ১০ এপ্রিল শুক্রবার পাকিস্তানের ইসলামাবাদে একটি বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল অংশ নেবে। এই বৈঠকেই নির্ধারিত হবে ১০ দফা প্রস্তাবের ভিত্তিতে কোনো স্থায়ী চুক্তি সম্ভব কি না। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এই মধ্যস্থতাকে একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
বিডি নিউজ সত্যকথা বিশ্লেষণ: শান্তির বার্তা নাকি নতুন কৌশলের খেলা?
বিডি নিউজ সত্যকথা-র বিশেষ বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, এই যুদ্ধবিরতি যেমন আশার আলো দেখাচ্ছে, তেমনি এর পেছনে রয়েছে গভীর ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ:
ট্রাম্পের রাজনৈতিক বিজয়: নির্বাচনের আগে বা ক্ষমতার মেয়াদে নিজেকে ‘শান্তিপ্রণেতা’ হিসেবে জাহির করা ট্রাম্পের পুরনো কৌশল। ইরানের ওপর ভয়াবহ হামলার হুমকি দিয়ে শেষ মুহূর্তে পিছু হটা এবং আলোচনা শুরু করা তাকে একজন দক্ষ ডিল-মেকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও ফি: ইরান যদি জাহাজ থেকে ২০ লাখ ডলার ফি আদায়ের শর্তে সফল হয়, তবে এটি আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনের জন্য এক নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। ওমানকে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা তেহরানের একটি বুদ্ধিদীপ্ত চাল, যাতে আঞ্চলিক সমর্থন পাওয়া যায়।
ইসরায়েলের অনমনীয়তা: নেতানিয়াহুর ‘লেবানন বাদ দিয়ে যুদ্ধবিরতি’ নীতি প্রমাণ করে যে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য সব সময় এক নয়। এটি ইরানের জন্য একটি ফাঁদও হতে পারে, যেখানে ইরান শান্ত থাকলেও তার প্রক্সি মিত্ররা (হিজবুল্লাহ) হামলার শিকার হতে থাকবে।
পাকিস্তানের ঐতিহাসিক ভূমিকা: এই সংকটে পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেকে বিশ্বমঞ্চে নতুনভাবে তুলে ধরেছে। চীনের সমর্থনপুষ্ট পাকিস্তানের এই উদ্যোগ সফল হলে দক্ষিণ এশিয়ায় দেশটির প্রভাব বহুগুণ বেড়ে যাবে।
পরিশেষে, এই দুই সপ্তাহ হবে মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। ইসলামাবাদ বৈঠক ব্যর্থ হলে এই সাময়িক বিরতি আরও ভয়াবহ যুদ্ধের পূর্বাভাস হতে পারে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন