![]() |
| ইরানের আকাশসীমায় মার্কিন ড্রোনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা (প্রতীকী ছবি) |
ট্রাম্পের আল্টিমেটাম ও ‘অপারেশন ইগল ক্ল’-এর স্মৃতি
ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই কুরুচিপূর্ণ হুমকির জবাবে ইরান কেবল কূটনৈতিক ভাষাতেই নয়, বরং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট টেনে পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছে। বিশ্বজুড়ে অবস্থিত ইরানের দূতাবাসগুলো থেকে মার্কিন বাহিনীকে ১৯৮০ সালের ২৪ এপ্রিলের কথা মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে। সে সময় ইরানের তাবাস মরুভূমিতে মার্কিন স্পেশাল ফোর্সের ‘অপারেশন ইগল ক্ল’ এক শোচনীয় পরাজয়ের সম্মুখীন হয়েছিল। ইরান স্পষ্ট করে জানিয়েছে, মার্কিনীদের উচিত তাদের অতীত ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেওয়া। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটলে ফলাফল এবার আরও ভয়াবহ হতে পারে।
রহস্যময় উদ্ধার অভিযান ও ইসফাহানের ধ্বংসাবশেষ
এই উত্তেজনার মূলে রয়েছে ইরানে মার্কিন এক ফাইটার পাইলটকে মুক্ত করার একটি ‘সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ’ অপারেশন। ট্রাম্প একে মার্কিন ইতিহাসের অন্যতম সাহসী ও ‘অলৌকিক’ অভিযান বলে দাবি করেছেন। তবে ইরান এই দাবিকে উড়িয়ে দিয়ে একে একটি ‘ব্যর্থ ও প্রতারণামূলক অনুপ্রবেশ’ হিসেবে অভিহিত করেছে। তেহরান ইসফাহানের দক্ষিণাঞ্চলে একটি পরিত্যক্ত বিমানঘাঁটিতে মার্কিন বাহিনীর ফেলে যাওয়া বেশ কিছু ধ্বংসপ্রাপ্ত বিমানের ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করেছে। ইরানের খাতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্সের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মার্কিন সেনারা মূলত অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালিয়েছিল যা ইরানি বাহিনীর পদক্ষেপে ভেস্তে যায়। যদিও মার্কিন সেনারা তাদের পাইলটকে নিয়ে যেতে পেরেছে কি না, সে বিষয়ে তেহরান রহস্যময় নীরবতা পালন করছে।
পারমাণবিক বিপর্যয়ের সতর্কবার্তা ও আঞ্চলিক প্রভাব
রণক্ষেত্রের এই উত্তেজনার মধ্যেই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক লোমহর্ষক সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, যদি আমেরিকা বা ইসরায়েল ইরানের বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কোনো হামলা চালায়, তবে তার পরিণতি কেবল ইরানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। আরাগচি সতর্ক করে বলেন, পারমাণবিক কেন্দ্র থেকে ছড়িয়ে পড়া তেজস্ক্রিয়তা তেহরানের চেয়েও কুয়েত, বাহরাইন বা কাতারসহ জিসিসি (GCC) দেশগুলোর জনজীবন আগে ধ্বংস করে দেবে। এই সতর্কবার্তা মূলত আরব দেশগুলোকে আমেরিকার ওপর চাপ সৃষ্টি করার একটি কৌশল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তেহরানে হামলা ও সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া
বিবিসি ফার্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোমবার ভোর থেকেই তেহরানের বিভিন্ন এলাকায় ইসরায়েল ও মার্কিন বাহিনী ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় শরিফ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং একটি গ্যাস স্টেশনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান ব্রডকাস্টিং (আইআরআইবি)-এর এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যদি বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা অব্যাহত থাকে, তবে ইরানের পরবর্তী প্রতিশোধমূলক অভিযান হবে আরও বিধ্বংসী ও ব্যাপক।
বিডি নিউজ সত্যকথা বিশ্লেষণ: ট্রাম্পের রণকৌশল ও বিশ্ব অর্থনীতি
বিডি নিউজ সত্যকথা-র বিশ্লেষণে এই সংকটের তিনটি প্রধান দিক উঠে এসেছে:
১. হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব: হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেলের পথ। এটি বন্ধ থাকা মানে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়া। ট্রাম্প মূলত মার্কিন অর্থনীতিকে রক্ষা করতেই সামরিক শক্তির আস্ফালন দেখাচ্ছেন। কিন্তু ইরানের পক্ষ থেকে দেওয়া পরমাণু তেজস্ক্রিয়তার হুমকি মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলোকে (কুয়েত, কাতার) শঙ্কিত করে তুলেছে।
২. মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ: ট্রাম্পের ‘মঙ্গলবার’ আল্টিমেটাম যতটা না সামরিক, তার চেয়ে বেশি মনস্তাত্ত্বিক। তিনি চাইছেন আলোচনার টেবিলে ইরানকে নতি স্বীকার করাতে। অন্যদিকে ইরান ১৯৮০ সালের পরাজয়ের স্মৃতি মনে করিয়ে দিয়ে ওয়াশিংটনের আত্মবিশ্বাসে ফাটল ধরাতে চাইছে।
৩. বেসামরিক লক্ষ্যবস্তু ও আন্তর্জাতিক আইন: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা গ্যাস স্টেশনের মতো বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। ইরান যদি এর প্রতিশোধ নিতে ইসরায়েল বা মার্কিন ঘাঁটিতে বড় ধরনের আঘাত হানে, তবে এটি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে মোড় নিতে পারে।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন