আন্তর্জাতিক ডেস্ক | বিডি নিউজ সত্যকথা
![]() |
| যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধি দলের ঐতিহাসিক প্রতীকী সংলাপ। (ছবি: বিডি নিউজ সত্যকথা)। |
ট্রাম্পের ঘোষণা ও সম্ভাব্য বড় অগ্রগতি
নিউইয়র্ক পোস্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে বলেন, “আপনাদের সেখানেই (পাকিস্তান) থাকা উচিত। কারণ আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বড় কোনো অগ্রগতি বা ‘কিছু একটা’ ঘটতে পারে। আমরা ইসলামাবাদে যাওয়ার ব্যাপারে বেশি আগ্রহী।” এর আগে গত ৭ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই সপ্তাহের এক অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল দুই দেশ। সেই যুদ্ধবিরতির রেশ কাটতে না কাটতেই ট্রাম্পের এই ঘোষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, পর্দার আড়ালে বড় কোনো সমঝোতা চলছে।
ইসলামাবাদ বৈঠকের ব্যর্থতা ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
উল্লেখ্য যে, গত শনিবার (১১ এপ্রিল) পাকিস্তানের ইসলামাবাদে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফের মধ্যে দীর্ঘ বৈঠক হয়েছিল। তবে অত্যন্ত গোপনীয় এই বৈঠকটি কোনো প্রকার আনুষ্ঠানিক চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়। বৈঠকের পর উভয় পক্ষই একে অপরকে দোষারোপ করে এবং এর পরপরই ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে অবরোধ আরোপ করেন। বিশ্বজুড়ে যখন আশঙ্কা করা হচ্ছিল যে এবার সরাসরি সংঘাত শুরু হবে, ঠিক তখনই ট্রাম্প আলোচনার টেবিলে ফেরার ঘোষণা দিলেন।
বিতর্কের মূলে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও হরমুজ প্রণালি
আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই দেশের মধ্যে বিরোধের মূল জায়গা এখন দুটি। প্রথমটি হলো ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি। ওয়াশিংটন দাবি করেছে, ইরানকে পরবর্তী ২০ বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি স্থগিত রাখতে হবে। তবে তেহরান কেবল ৫ বছরের জন্য স্থগিতাদেশ মানতে রাজি হয়েছে।
দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়টি হলো হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ। ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা এবং সামরিক কমান্ড স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা আগের মতো থাকবে না। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন চাচ্ছে এই জলসীমায় নিরঙ্কুশ মার্কিন ও আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ। এছাড়া ইরানের কাছে থাকা ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ৪৫০ কেজির বেশি ইউরেনিয়াম ধ্বংস করা বা এর মাত্রা ৩ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা নিয়েও দরকষাকষি চলছে।
তেহরানের নীরবতা ও রাশিয়ার প্রভাব
মার্কিন প্রেসিডেন্ট আলোচনার কথা বললেও ইরানের পক্ষ থেকে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি। মঙ্গলবার ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম জানিয়েছে, পাকিস্তান ও তেহরানের মধ্যে নিয়মিত বার্তা বিনিময় হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পুনরায় সরাসরি বৈঠকে বসার মতো কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য তাদের হাতে নেই। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরান সম্ভবত এই বিষয়ে রাশিয়ার সাথে পরামর্শ করছে। কারণ সাম্প্রতিক গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া ইরানকে ড্রোন ও স্যাটেলাইট ডাটা দিয়ে সহায়তা করছে।
কেন পাকিস্তানই আলোচনার কেন্দ্র?
ট্রাম্প এর আগে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে দ্বিতীয় দফার আলোচনা ইউরোপের কোনো দেশে হতে পারে। কিন্তু হঠাৎ করেই তিনি পুনরায় ইসলামাবাদে ফেরার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। এর প্রধান কারণ হলো পাকিস্তানের ভৌগোলিক অবস্থান এবং ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র—উভয় দেশের সাথেই ইসলামাবাদের কূটনৈতিক ভারসাম্য। এছাড়া ৫ সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর প্রথম যুদ্ধবিরতিও অর্জিত হয়েছিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায়।
বিডি নিউজ সত্যকথা বিশ্লেষণ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই পাল্টাপাল্টি অবস্থান অনেকটা ‘শীতল যুদ্ধের’ চরম অবস্থার মতো। ডোনাল্ড ট্রাম্পের কৌশল হলো ‘ম্যাক্সিমাম প্রেশার’ বা সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগ করা। একদিকে তিনি নৌ-অবরোধ দিয়ে ইরানের অর্থনীতি ও সামরিক শক্তিকে শ্বাসরোধ করতে চাইছেন, অন্যদিকে আলোচনার প্রস্তাব দিয়ে নিজেকে শান্তিবাদী হিসেবে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরছেন।
আমাদের বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ইরান এই মুহূর্তে একটি কূটনৈতিক ফাঁদে রয়েছে। যদি তারা আলোচনায় না বসে, তবে মার্কিন অবরোধ তাদের অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দেবে। আর যদি ট্রাম্পের কঠিন শর্ত মেনে আলোচনায় বসে, তবে অভ্যন্তরীণভাবে আইআরজিসি বা কট্টরপন্থীদের চাপের মুখে পড়বে তেহরান। তবে ৪৫০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বিষয়টিই হতে পারে এই যুদ্ধের চূড়ান্ত ফয়সালা। যদি ইরান এটি ৩ শতাংশে কমিয়ে আনতে রাজি হয়, তবেই হয়তো হরমুজে শান্তি ফিরবে। অন্যথায় আগামী ৪৮ ঘণ্টা কেবল আলোচনার নয়, বরং এক ভয়াবহ যুদ্ধের সূচনালগ্নও হতে পারে।
আরও পড়ুন: নববর্ষের ঐকতান: ১৪৩৩-কে বরণ করে নিল বাঙালি
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন