![]() |
| লেবাননে ইসরায়েলি বিমান হামলার ধ্বংসযজ্ঞ ও ইরানের হরমুজ প্রণালি অবরোধের প্রতীকী দৃশ্য। |
বৈরুত থেকে টায়ার: ১০ মিনিটের ধ্বংসলীলা
লেবাননের জরুরি পরিষেবা সংস্থা (সিভিল ডিফেন্স) জানিয়েছে, বুধবারের এই হামলা ছিল ১৯৮২ সালের ইসরায়েলি আগ্রাসনের পর সবচেয়ে ভয়াবহ। ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানগুলো লেবাননের আবাসিক ভবন, মসজিদ, যানবাহন এবং এমনকি কবরস্থান লক্ষ্য করে শত শত টন বোমা বর্ষণ করেছে। সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা রাজধানী বৈরুতের। সেখানে ৯২ জন নিহত এবং ৭৪২ জন আহত হয়েছেন। বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলিতে প্রাণ হারিয়েছেন আরও ৬১ জন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বর্ণনা দিয়েছেন, মাত্র ১০ মিনিটের ব্যবধানে বৈরুতসহ ১০০টির বেশি স্থানে একযোগে বিমান হামলা চালানো হয়েছে। নাবাতিয়েহ এলাকায় ২৮ জন, বালবেকে ১৮ জন এবং আলেই জেলায় ১৭ জন নিহত হয়েছেন। লেবাননের স্বাস্থ্যমন্ত্রী রাকান নাসেরুদ্দিন জানিয়েছেন, উদ্ধার অভিযান এখনো অব্যাহত থাকায় নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। লেবাননের পার্লামেন্ট স্পিকার নাবিহ বেরি এই পদক্ষেপকে ‘পূর্ণমাত্রার যুদ্ধাপরাধ’ বলে আখ্যা দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
চুক্তির শর্ত নিয়ে ধোঁয়াশা ও ইসরায়েলি অবস্থান
এই ভয়াবহ সংকটের মূলে রয়েছে যুদ্ধবিরতির আওতা নিয়ে ইসরায়েল ও ইরানের ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা। হিজবুল্লাহ কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধবিরতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং তারা ইসরায়েলে সব ধরনের হামলা স্থগিত রেখেছেন। তেহরানের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছিল যে লেবানন ফ্রন্টও এই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত। এমনকি শান্তি আলোচনার অন্যতম মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফও দাবি করেছিলেন, চুক্তিতে হিজবুল্লাহর ওপর হামলা বন্ধ রাখার কথা উল্লেখ আছে।
তবে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং হোয়াইট হাউস এই দাবি সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলাইন লেভিট এক সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্ট করেছেন যে, বর্তমান চুক্তির পরিধিতে লেবানন বা হিজবুল্লাহ অন্তর্ভুক্ত নেই। নেতানিয়াহু সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে তাদের সামরিক অভিযান থামবে না। ইসরায়েলের সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াল জামির বলেছেন, হিজবুল্লাহ যেসব স্থানকে ‘নিরাপদ’ মনে করত, সেগুলোতে কোনো ধরনের আপস ছাড়াই আঘাত হানা অব্যাহত থাকবে।
ইরানের কঠোর অবস্থান: ফের বন্ধ হরমুজ প্রণালি
লেবাননে এই ব্যাপক হামলার খবর আসার পরপরই কঠোর অবস্থান নিয়েছে তেহরান। ডোনাল্ড ট্রাম্পের আলটিমেটামের মুখে ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে রাজি হলেও, বুধবার সকালে সেটি পুনরায় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেয়। ইরানের আধা সরকারি বার্তা সংস্থা ‘ফারস নিউজ’ জানিয়েছে, মাত্র দুটি ট্যাংকার পার হওয়ার পর আর কোনো যান চলাচল করতে দেওয়া হয়নি।
ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের সঙ্গে জরুরি ফোনালাপে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের’ অভিযোগ তুলেছেন। তেহরান থেকে সতর্ক করা হয়েছে, লেবাননে হামলা অবিলম্বে বন্ধ না হলে তারা এই শান্তিচুক্তি থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসবে এবং পাল্টা সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এই ঘটনার ফলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে; কয়েক শ তেলবাহী ট্যাংকার ভারত মহাসাগরে আটকা পড়েছে।
আরও পড়ুন: মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কালো ছায়া বাংলাদেশের অর্থনীতিতে: নতুন করে ১২ লাখ মানুষ চরম দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে
পাল্টা রকেট হামলা ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর হোম ফ্রন্ট কমান্ড জানিয়েছে, লেবাননে ভয়াবহ বিমান হামলার প্রতিক্রিয়ায় দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলের দিকে রকেট ছোড়া হয়েছে। শতুলা এবং পশ্চিম গ্যালিলি অঞ্চলের শহরগুলোতে সাইরেন বাজছে। যদিও হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে হামলার দায় স্বীকার করা হয়নি, তবে এটি স্পষ্ট যে শান্তিচুক্তি এখন খাদের কিনারায়। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল-জাজিরা ও বিবিসি জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি কার্যকরের কয়েক ঘণ্টার মাথায় এমন পরিস্থিতি পুরো বিশ্বকে নতুন এক আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কায় ফেলে দিয়েছে।
বিডি নিউজ সত্যকথা বিশ্লেষণ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এই ‘যুদ্ধবিরতি’ আদতে কতটা টেকসই, তা নিয়ে প্রথম দিনেই বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিল। ইসরায়েলের দাবি অনুযায়ী যদি হিজবুল্লাহ বা লেবানন এই চুক্তির বাইরে থাকে, তবে মধ্যপ্রাচ্যে সত্যিকারের শান্তি আসা অসম্ভব। ইরান সরাসরি যুদ্ধে না জড়ালেও তাদের ‘প্রক্সি’ শক্তিগুলোর ওপর হামলা চালানো হলে তারা যে চুপ থাকবে না, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়ে তেহরান সেই বার্তাই দিয়েছে।
আমাদের বিশ্লেষণে মনে হয়, ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যস্থতায় করা এই চুক্তিতে লেবানন ইস্যুটিকে অস্পষ্ট রাখা ছিল একটি বড় কৌশলগত ভুল। ইসরায়েল মনে করছে তারা ইরানের হাত বেঁধে রেখে হিজবুল্লাহকে নির্মূল করার সুযোগ পেয়েছে। অন্যদিকে ইরান মনে করছে এটি তাদের পিঠে ছুরি মারা। এই পারস্পরিক অবিশ্বাসের ফলে কেবল সাধারণ বেসামরিক মানুষই প্রাণ হারাচ্ছে না, বরং বিশ্ব জ্বালানি বাজার ও অর্থনীতি এক দীর্ঘমেয়াদী সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছে। আগামী ৪৮ ঘণ্টা হবে এই চুক্তির ভাগ্য নির্ধারণী সময়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন