আন্তর্জাতিক ডেস্ক | বিডি নিউজ সত্যকথা
পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যবর্তী এই সংকীর্ণ জলপথটি বিশ্ব বাণিজ্যের, বিশেষ করে জ্বালানি তেল পরিবহনের লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরান এই পথে জাহাজ চলাচলের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছিল। তেহরান মনে করছে, তাদের জলসীমা ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চললে তার বিনিময়ে রাষ্ট্রের রাজস্ব পাওয়ার আইনগত অধিকার রয়েছে।
ইরানি পার্লামেন্টের দ্বিতীয় ডেপুটি স্পিকার হাজি বাবাই বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে জানান, এই আন্তর্জাতিক জলপথ দিয়ে যাতায়াত করা ভেসেল বা জাহাজগুলো থেকে নির্ধারিত ফি বা টোল সংগ্রহ করা হচ্ছে। তিনি আরও নিশ্চিত করেন যে, সংগৃহীত টোলের প্রথম দফার অর্থ ইতিমধ্যে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা হয়েছে। একে ইরানের জাতীয় রাজস্ব আয়ের এক নতুন এবং শক্তিশালী উৎস হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বন্ধুরাষ্ট্রদের জন্য ছাড়: তালিকায় রাশিয়া ও অন্যান্যরা
রুশ সংবাদ সংস্থা ‘আরআইএ নভোস্তি’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানি রাষ্ট্রদূত কাজেম জালালি বলেন, “আমরা কিছু দেশের জন্য বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা করেছি। বর্তমানে আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলোর জন্য এই সুবিধাগুলো কার্যকর করার চেষ্টা করছে, যার অন্যতম উদাহরণ হলো রাশিয়া।”
রাষ্ট্রদূত জালালি আরও ইঙ্গিত দেন যে, ভবিষ্যতে পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এই তালিকার পরিবর্তন হতে পারে। তবে এই তালিকায় রাশিয়ার পাশাপাশি আর কোন কোন দেশ রয়েছে, তা নিয়ে জল্পনা চলছে। এর আগে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক সাক্ষাৎকারে মিত্র হিসেবে বাংলাদেশ, চীন, পাকিস্তান, ইরাক ও ভারতের নাম উল্লেখ করেছিলেন। যদিও বর্তমান অফিসিয়াল তালিকায় এই দেশগুলোর অবস্থান কোথায়, তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে স্পষ্ট করা হয়নি।
হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব ও বৈশ্বিক প্রভাব
হরমুজ প্রণালি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, তা এর পরিসংখ্যান থেকেই স্পষ্ট। বৈশ্বিক তেল ব্যবহারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ (প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল) এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। উন্মুক্ত মহাসাগরে যাওয়ার একমাত্র পথ হওয়ার কারণে এটি মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জন্য অপরিহার্য।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এই টোল আরোপের মাধ্যমে কেবল অর্থ আয় করতে চায় না, বরং এটি তাদের আঞ্চলিক শক্তি প্রদর্শনের একটি মাধ্যম। বিশেষ করে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার জবাবে এই জলপথের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে ইরান বিশ্ব অর্থনীতিতে তাদের প্রভাব বজায় রাখতে চায়।
বিডি নিউজ সত্যকথা বিশ্লেষণ:
ইরানের এই পদক্ষেপ কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং এটি একটি সুদূরপ্রসারী ‘কূটনৈতিক অস্ত্র’। হরমুজ প্রণালিতে টোল আরোপের মাধ্যমে ইরান কার্যত ঘোষণা করল যে, এই জলপথের সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ এখন থেকে তাদের হাতে। মিত্র দেশগুলোকে ছাড় দিয়ে ইরান বৈশ্বিক মেরুকরণে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করছে।
রাশিয়াকে এই তালিকায় শীর্ষে রাখা এটাই প্রমাণ করে যে, ইউক্রেন যুদ্ধ পরবর্তী বিশ্ব পরিস্থিতিতে তেহরান ও মস্কোর সম্পর্ক এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। অন্যদিকে, পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য এই টোল আরোপ তাদের পরিবহন খরচ বাড়িয়ে দেবে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলতে পারে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো যদি এই ছাড়ের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়, তবে তা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বড় ভূমিকা রাখবে। তবে এই নীতি আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন (UNCLOS) এর সাথে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে ভবিষ্যতে আইনি বিতর্ক ওঠার সম্ভাবনা থেকেই যায়।
আরও পড়ুন: শান্তর শতক ও মুস্তাফিজের ফাইফারে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ জয় বাংলাদেশের
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন