সত্যকথা রিপোর্ট
![]() |
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর্যবেক্ষক দলের মতে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল অবাধ ও শান্তিপূর্ণ। ছবি:প্রতীকী। |
পর্যবেক্ষকদের চোখে ভোটের মাঠ
ইউরোপীয় ইউনিয়ন নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান ইভার্স ইজাবস প্রতিবেদনটি পাঠ করে শোনান। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করেই তারা তাদের পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। ইজাবসের মতে, “নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন (ইসি) রাজনৈতিক দল ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি কার্যকর ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হয়েছে।”
স্মর্তব্য যে, ১২ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করেছে এবং জামায়াতে ইসলামী বিরোধী দলের আসনে বসেছে। নির্বাচনের পরপরই কিছু রাজনৈতিক দল ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর অভিযোগ তুললেও ইইউ-র এই চূড়ান্ত প্রতিবেদন সেই দাবিকে অসার প্রমাণ করল।
দীর্ঘ মেয়াদী পর্যবেক্ষণ ও বিশাল কর্মযজ্ঞ
এই প্রতিবেদনটি কোনো আকস্মিক মন্তব্য নয়, বরং দীর্ঘ কয়েক মাসের নিবিড় পর্যবেক্ষণের ফসল। গত বছরের শেষ দিক থেকে ইইউ-র প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে অবস্থান করছে। নির্বাচনের দিন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সব সদস্য রাষ্ট্রের পাশাপাশি কানাডা, নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ড থেকে আসা মোট ২২৩ জন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক দেশের ৬৪টি প্রশাসনিক জেলায় ছড়িয়ে পড়েছিলেন। যার মধ্যে ৫৬ জন ছিলেন দীর্ঘমেয়াদী এবং ৯০ জন স্বল্পমেয়াদী পর্যবেক্ষক। ১৪ ফেব্রুয়ারি প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশের দীর্ঘ আড়াই মাস পর আজ তারা এই পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত নথি তুলে ধরলেন।
১৯ দফা সুপারিশ: ভবিষ্যৎ নির্বাচন ব্যবস্থার রোডম্যাপ
ইইউ শুধুমাত্র নির্বাচনের মানপত্র দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, বরং বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে ১৯টি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ পেশ করেছে। এর মধ্যে ৬টি সুপারিশকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য সুপারিশগুলো হলো:
ডিজিটাল নিরাপত্তা ও নারী অধিকার: অনলাইন বা ডিজিটাল মাধ্যমে নারী প্রার্থীদের হয়রানি ও হেনস্তা প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ।
নারীর অংশগ্রহণ: রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অন্তত এক-তৃতীয়াংশ নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
আর্থিক স্বচ্ছতা: প্রার্থীদের নির্বাচনী ব্যয়ের নিরীক্ষা (Audit) বা অডিট ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী ও স্বচ্ছ করা।
অন্তর্ভুক্তিমূলক ভোট: প্রতিবন্ধী ভোটারদের জন্য ভোটকেন্দ্রে বিশেষ সুবিধা বৃদ্ধি করা যাতে তারা সহজে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন।
ইভার্স ইজাবস আশা প্রকাশ করেন যে, পরবর্তী নির্বাচনগুলো আরও বেশি প্রতিযোগিতাপূর্ণ হবে এবং রাজনৈতিক দলগুলো তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে।
ভোটার উপস্থিতি ও পোস্টাল ব্যালট
প্রতিবেদনে ভোটার উপস্থিতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে। বিশেষ করে পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থা, যা অনেক ক্ষেত্রে অবহেলিত থাকে, সেটির ইতিবাচক মূল্যায়ন করেছে ইইউ। পর্যবেক্ষকদের মতে, জনগণের অংশগ্রহণ এবং ভোট প্রদানের পরিবেশ ছিল শান্তিপূর্ণ, যা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য শুভলক্ষণ।
বিডি নিউজ সত্যকথা বিশ্লেষণ
ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই চূড়ান্ত প্রতিবেদন বাংলাদেশের বর্তমান গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় একটি বড় মাইলফলক। বিশেষ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে যে প্রশ্ন ছিল, তা এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে অনেকটাই স্তিমিত হলো।
তবে বিডি নিউজ সত্যকথা মনে করে, ইইউ-র দেওয়া ১৯টি সুপারিশ শুধুমাত্র কাগুজে দলিল হিসেবে রেখে দিলে চলবে না। ডিজিটাল মাধ্যমে নারী হেনস্তা রোধ এবং নির্বাচনী ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা আমাদের রাজনীতির দীর্ঘদিনের দাবি। বিএনপি সরকার এবং বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর উচিত এই সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে নির্বাচন কমিশনকে পূর্ণ সহযোগিতা করা। একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক ধারার জন্য ইইউ-র এই পর্যবেক্ষণকে দিকনির্দেশনা হিসেবে গ্রহণ করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
আরও পড়ুন: ইরানের প্রস্তাবে ট্রাম্পের ‘না’: পারমাণবিক ইস্যুতে ফের যুদ্ধের উত্তেজনা!
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন