হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে গত শুক্রবার এক ঐতিহাসিক বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন বিশ্বের সবথেকে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলোর প্রধান নির্বাহীরা। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আহ্বানে আয়োজিত এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন আরটিএক্স (RTX), লকহিড মার্টিন, বোয়িং, নর্থরোপ গ্রুমম্যান, বিএই সিস্টেমস, এল-থ্রি হ্যারিস এবং হানিওয়েল অ্যারোস্পেসের মতো দানবীয় প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্তারা। বৈঠকের মূল নির্যাস— আমেরিকার তথাকথিত ‘এক্সকুইজিট ক্লাস’ বা অতি-উন্নত মানের সমরাস্ত্রের উৎপাদন চারগুণ বৃদ্ধি করা।
ইরান যুদ্ধ: সমরাস্ত্রের পরীক্ষাগার ও মুনাফার উৎস
ইরানের সাথে চলমান যুদ্ধে আমেরিকা ইতিমধ্যে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র ব্যবহার করেছে, যা প্রতিরক্ষা ঠিকাদারদের জন্য যুদ্ধকে একটি উচ্চ মুনাফাজনক ব্যবসায় পরিণত করেছে। গত সপ্তাহে নর্থরোপ গ্রুমম্যানের শেয়ার দর ৫ শতাংশ, আরটিএক্স-এর ৪.৫ শতাংশ এবং লকহিড মার্টিনের ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বর্তমানে ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত প্রধান অস্ত্রসমূহ:
ক্ষেপণাস্ত্র ও আক্রমণভাগ: তিন দশক ধরে পেন্টাগনের প্রধান অস্ত্র ‘টমাহক’ ক্রুজ মিসাইল আরলি বার্ক-ক্লাস ডেস্ট্রয়ার থেকে নিক্ষেপ করা হচ্ছে। এছাড়া প্রথমবারের মতো মরুভূমি থেকে 'প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল' (PrSM) ব্যবহার করা হয়েছে ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে।
প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা: ইরানের পাল্টা হামলা রুখতে প্যাট্রিয়ট এবং থাড (THAAD) মিসাইল সিস্টেম মোতায়েন করা হয়েছে।
ড্রোনের অভিষেক: এই যুদ্ধে অভিষেক ঘটেছে সল্পমূল্যের ‘লুকাস’ (LUCAS) ড্রোনের, যা স্পেকট্রে-ওয়ার্কস তৈরি করেছে। মাত্র ৩৫,০০০ ডলার মূল্যের এই ড্রোনটি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোনের (মূল্য ৪০ মিলিয়ন ডলার) তুলনায় অনেক সাশ্রয়ী।
আকাশপথের আধিপত্য: বি-১ ও বি-২ বোমারু বিমান ছাড়াও এফ-২২ র্যাপ্টর এবং এফ-৩৫ স্টিলথ ফাইটার ব্যবহার করা হচ্ছে তেহরানের ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার ধ্বংস করতে।
যুদ্ধের অর্থনীতি ও প্রতিরক্ষা শিল্পের আধিপত্য
১. মার্কিন প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলোর বিশ্বজয়
২০২৪ সালে বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি প্রতিরক্ষা সংস্থা মোট ৬৭৯ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব আয় করেছে। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক আয় (৩৩৪ বিলিয়ন ডলার) করেছে মার্কিন সংস্থাগুলো। তালিকায় আমেরিকার পরেই রয়েছে চীন (৮৮ বিলিয়ন ডলার) এবং যুক্তরাজ্য (৫২ বিলিয়ন ডলার)।
শীর্ষ ৫ মার্কিন ঠিকাদারের প্রভাব:
লকহিড মার্টিন: বিশ্বের বৃহত্তম ঠিকাদার, যার ২০২৪ সালের রাজস্ব ছিল ৬৮.৪ বিলিয়ন ডলার। তারা এফ-৩৫ ফাইটার ও থাড সিস্টেম তৈরি করে।
আরটিএক্স (RTX): টমাহক এবং প্যাট্রিয়ট মিসাইল প্রস্তুতকারক এই সংস্থাটির গত বছরের প্রতিরক্ষা রাজস্ব ছিল ৪৩.৬ বিলিয়ন ডলার।
নর্থরোপ গ্রুমম্যান: স্টিলথ প্রযুক্তির রাজা হিসেবে পরিচিত এই প্রতিষ্ঠানটি বি-২ বোমারু বিমান তৈরি করে।
২. ইজরায়েলি প্রতিরক্ষা খাতের উত্থান
মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের মধ্যে ইজরায়েলি প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলোর রপ্তানি বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সিপ্রি (SIPRI)-র তথ্য অনুযায়ী শীর্ষ ১০০টি কোম্পানির তালিকায় ইজরায়েলের তিনটি বড় নাম রয়েছে।
এলবিট সিস্টেমস: ড্রোন ও নজরদারি ব্যবস্থায় বিশেষজ্ঞ এই প্রতিষ্ঠানটি ৬.৩ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে।
রাফায়েল: বিখ্যাত 'আয়রন ডোম' ব্যবস্থার নির্মাতা এই প্রতিষ্ঠানটি ৪.৭ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব পেয়েছে।
৩. শেয়ার বাজারের জোয়ার: কার লাভ কত?
২০২৩ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত মার্কিন প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলোর শেয়ার দরে অভাবনীয় উল্লম্ফন দেখা গেছে। গত তিন বছরে আরটিএক্স-এর শেয়ার দর বেড়েছে ১১০ শতাংশ, নর্থরোপ গ্রুমম্যানের ৬০ শতাংশ এবং জেনারেল ডাইনামিক্সের ৫৭ শতাংশ। ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে ফুরিয়ে যাওয়া গোলাবারুদ ও অস্ত্রের ভাণ্ডার নতুন করে পূর্ণ করতে মার্কিন সরকার যে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ক্রয়াদেশ দিচ্ছে, তা-ই এই শেয়ার দর বৃদ্ধির প্রধান কারণ।
৪. ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব ও ‘ফরোয়ার্ড ডিফেন্স’
আমেরিকা তার নৌবাহিনীর বিশাল উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে আরব সাগর ও ভূমধ্যসাগরে। ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন এবং ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড এয়ারক্রাফ্ট ক্যারিয়ার এই অঞ্চলের সামরিক ভারসাম্যে আমেরিকার পাল্লা ভারী করে রেখেছে。 ই-৩ সেন্ট্রি (AWACS) এবং আরসি-১৩৫ স্পাই প্লেনগুলো কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ঘাঁটি থেকে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করছে。
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ‘অস্ত্র উৎপাদন চারগুণ’ করার ঘোষণা বিশ্বজুড়ে এক নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে যখন যুদ্ধের ময়দানে প্রাণহানি ও ধ্বংসলীলা চলছে, অন্যদিকে ওয়াশিংটনের বোর্ডরুমগুলোতে জমা হচ্ছে বিলিয়ন ডলারের মুনাফা। এই যুদ্ধ কেবল আদর্শ বা ভূখণ্ডের নয়, বরং এটি সমরাস্ত্রের বাজার দখলের এক বিশাল অর্থনৈতিক লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন