ট্রাম্পের ৬ শর্ত: নতি স্বীকার নাকি কৌশল?
সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস নিউজ জানিয়েছে, ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনার একটি শান্তি চুক্তির খসড়া তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। যদিও লড়াই আরও কয়েক সপ্তাহ চলার সম্ভাবনা রয়েছে, তবুও হোয়াইট হাউস দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য ৬টি সুনির্দিষ্ট দাবি উত্থাপন করেছে:
১. আগামী ৫ বছর ইরানের সব ধরণের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ রাখা।
২. ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা।
৩. নাতাঞ্জ, ইসফাহান ও ফোরডোর মতো পারমাণবিক স্থাপনাগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ করা।
৪. হিজবুল্লাহ, হুথি ও হামাসের মতো প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে অর্থায়ন ও সমর্থন বন্ধ করা।
৫. হরমুজ প্রণালী বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য স্থায়ীভাবে উন্মুক্ত রাখা।
৬. মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নষ্ট না করার আন্তর্জাতিক গ্যারান্টি প্রদান।
মার্কিন কর্মকর্তাদের ধারণা, অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপে ইরান এই শর্তগুলো মানতে বাধ্য হতে পারে। তবে ট্রাম্পের এই প্যাকেজ চুক্তিতে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কোনো সুযোগ রাখা হয়নি।
ইরানের পাল্টা ৬ দফা: অনড় তেহরান
এদিকে মেহের নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান কোনোভাবেই মার্কিন চাপের মুখে মাথা নত করতে রাজি নয়। তেহরানের এক জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা আল-মায়াদিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন, তারা বর্তমানে ‘কৌশলগত ধৈর্য’ নীতি অবলম্বন করছেন এবং ইসরায়েলের আকাশসীমায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছেন। ইরানের দেওয়া ৬টি শর্ত হলো:
১. ভবিষ্যতে পুনরায় কোনো আক্রমণ হবে না—এমন আন্তর্জাতিক ও আইনি গ্যারান্টি।
২. মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল থেকে সব মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থায়ীভাবে প্রত্যাহার।
৩. যুদ্ধের ফলে ইরানের যে বিশাল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার পূর্ণ আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদান।
৪. সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে সব ধরনের পশ্চিমা সামরিক তৎপরতা ও যুদ্ধ বন্ধ করা।
৫. হরমুজ প্রণালী নিয়ে ইরানের সার্বভৌমত্ব বজায় রেখে একটি নতুন আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো গঠন।
৬. ইরানবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত নির্দিষ্ট গণমাধ্যম ব্যক্তিদের বিচার এবং ইরানের কাছে হস্তান্তর।
মধ্যস্থতায় কাতার ও মিশরের তৎপরতা
সরাসরি যোগাযোগ না থাকলেও মিসর, কাতার এবং যুক্তরাজ্যের মাধ্যমে উভয় পক্ষ বার্তার আদান-প্রদান করছে। কাতার বর্তমানে মূল মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে, কারণ গাজা সংকটে তারা তাদের কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ওমানের ওপর অনাস্থা প্রকাশ করায় কাতারের ওপর চাপ বেড়েছে। ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালী স্বাভাবিক করার চাবিকাঠি এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হাতে—তাদের হামলা বন্ধ করতে হবে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই পাল্টাপাল্টি শর্তাবলি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, উভয় পক্ষই আসলে আলোচনার টেবিলে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে। ট্রাম্প প্রশাসন চাইছে ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতাকে চিরতরে স্তব্ধ করতে, যা মূলত ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের চাওয়া। অন্যদিকে, ইরান চাইছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন উপস্থিতি হটিয়ে নিজেদের আঞ্চলিক আধিপত্য রক্ষা করতে।
বাস্তবতা হলো, ইরানের দেওয়া ‘মার্কিন ঘাঁটি প্রত্যাহার’ বা ‘গণমাধ্যম ব্যক্তিদের হস্তান্তর’-এর মতো শর্তগুলো ওয়াশিংটনের পক্ষে মেনে নেওয়া প্রায় অসম্ভব। আবার ট্রাম্পের ‘ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শূন্য’ করার দাবিও ইরানের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হিসেবে দেখছে তেহরান। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো অনিশ্চিত একজন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছানো ইরানের জন্য বড় ঝুঁকি, কারণ তারা মনে করে ট্রাম্প যেকোনো সময় আলোচনার মাঝপথে বোমা হামলার নির্দেশ দিতে পারেন। শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধ কি চুক্তিতে শেষ হবে, নাকি আরও বড় আঞ্চলিক মহাপ্রলয়ের দিকে এগোবে, তা নির্ভর করছে আগামী কয়েক দিনের কূটনৈতিক তৎপরতার ওপর।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন