খামেনি পরবর্তী ইরান ও মোজতবা খামেনির উত্থান
দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময় ধরে ইরানের আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে তার নিজ বাসভবনে মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হন। ৮৬ বছর বয়সী এই নেতার মৃত্যুতে ইরান কেবল একজন শাসককেই হারায়নি, বরং তাদের দীর্ঘদিনের পশ্চিমা-বিরোধী প্রতিরোধের প্রধান স্থপতিকেও হারিয়েছে। বাবার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার সূত্রে এবং উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মোজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা ঘোষণা করা হয়েছে। বুধবার এক অগ্নিঝরা বিবৃতিতে মোজতবা খামেনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, লারিজানি এবং অন্যান্য শহীদ নেতাদের প্রতিটি ফোঁটা রক্তের হিসাব নেওয়া হবে এবং খুনিদের এর জন্য ‘চরম মূল্য’ দিতে হবে।
সামরিক ও গোয়েন্দা কাঠামোয় ধস
হামলার ধারা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি ছিল সুপরিকল্পিত এবং অত্যন্ত নিখুঁত। একই দিনে আইআরজিসি প্রধান মোহাম্মদ পাকপুর, প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহ এবং সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান আবদোলরহিম মুসাভি নিহত হওয়ায় ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কার্যত নেতৃত্বহীন হয়ে পড়েছে। এরপর গত ১৭ মার্চ পারদিস এলাকায় বিমান হামলায় নিহত হন খামেনির বিশ্বস্ত উপদেষ্টা ও নিরাপত্তা কৌশলের মূল কারিগর আলী লারিজানি। লারিজানির সাথে তার পুত্র এবং বাসিজ প্রধান গোলামরেজা সোলেইমানিও প্রাণ হারান। সর্বশেষ বুধবার গোয়েন্দামন্ত্রী ইসমাইল খতিবের মৃত্যু ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও তথ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে পুরোপুরি পঙ্গু করে দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের অভিমত: এক নতুন ও অনিশ্চিত মধ্যপ্রাচ্য
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই প্রশাসনিক বিপর্যয় দেশটির ইতিহাসে এর আগে কখনও ঘটেনি। সাধারণত কোনো দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের একজন বা দুজন নিহত হলে বিকল্প নেতৃত্ব দ্রুত হাল ধরতে পারে, কিন্তু এখানে প্রায় পুরো ‘চেইন অফ কমান্ড’ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ কর্তৃক ইরানি কর্মকর্তাদের হত্যার জন্য স্থায়ী ও উন্মুক্ত অনুমতি দেওয়ার ঘোষণা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এখন থেকে যেকোনো ইরানি জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে হত্যা করতে ইসরায়েলি বাহিনীকে আর প্রশাসনিক অনুমতির অপেক্ষা করতে হবে না।
এই ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড কেবল ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং এটি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং পারস্য উপসাগরের নৌ-চলাচল ব্যবস্থায় বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল সরবরাহ বন্ধ হওয়ার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। নতুন নেতা মোজতবা খামেনি প্রতিশোধের যে শপথ নিয়েছেন, তা যদি কার্যকর হয়, তবে পুরো অঞ্চল একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধের দিকে ধাবিত হতে পারে। ওয়াশিংটন এবং তেল আবিব এই অভিযানকে ‘সন্ত্রাসবাদ নির্মূল’ হিসেবে দাবি করলেও, তেহরান একে সার্বভৌমত্বের ওপর চরম আঘাত হিসেবে দেখছে। এখন দেখার বিষয়, মোজতবা খামেনির নেতৃত্বাধীন নতুন ইরান এই ধ্বংসস্তূপ থেকে কীভাবে ঘুরে দাঁড়ায় এবং তাদের পরবর্তী সামরিক পদক্ষেপ কী হয়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন