ঢাকা, ২২ সেপ্টেম্বর (নিজস্ব প্রতিবেদক):
পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এসেছে। গাজা, পশ্চিম তীরসহ পুরো ফিলিস্তিন অঞ্চলে রক্ত, অশ্রু ও আত্মত্যাগে গড়া এই সংগ্রাম সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন মোড় নিয়েছে। দীর্ঘদিনের দাবি ও লড়াইয়ের ফলস্বরূপ ক্রমশই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বাড়ছে ফিলিস্তিনের প্রতি।
সম্প্রতি কানাডা, আয়ারল্যান্ড এবং স্পেন ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এর ফলে জাতিসংঘের মোট ১৯৩ সদস্যের মধ্যে ১৩৮টি দেশ এখন আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকার করছে। অর্থাৎ বিশ্বের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ দেশ ফিলিস্তিনকে একটি বৈধ রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এ সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে ফিলিস্তিনের জন্য এক বড় কূটনৈতিক সাফল্য এবং রাজনৈতিক মাইলফলক।
আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে কোনো দেশকে স্বীকৃতি দেওয়া মানে হলো তাকে একটি বৈধ রাষ্ট্র হিসেবে মেনে নেওয়া। এই স্বীকৃতি পাওয়ার মাধ্যমে ফিলিস্তিনি জনগণ শুধু রাজনৈতিক মর্যাদা নয়, বরং নিজেদের আত্মপরিচয়েরও একটি বৈশ্বিক স্বীকৃতি পেল। যদিও এই স্বীকৃতির পরপরই সীমান্ত পরিবর্তন, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বা দখলকৃত ভূখণ্ডের মুক্তি ঘটবে না, তবে ভবিষ্যতের শান্তি আলোচনায় ফিলিস্তিন এখন আরও শক্তিশালী অবস্থানে দাঁড়াতে পারবে।
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন ধরে শান্তি প্রক্রিয়া স্থবির। ইসরায়েলের কঠোর অবস্থান ও যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা সমর্থনের কারণে ফিলিস্তিনের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ বারবার জটিল হয়ে পড়েছে। তবে ইউরোপের কয়েকটি প্রভাবশালী দেশ যখন ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিল, তখন একটি নতুন ভারসাম্য তৈরি হলো। ইসরায়েলের ওপর কূটনৈতিক চাপ বাড়বে, ফলে শান্তি আলোচনার নতুন পথ খুলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র। ওয়াশিংটন সবসময় দুই-রাষ্ট্র সমাধানের পক্ষে মৌখিক সমর্থন জানালেও বাস্তবে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। বরং জাতিসংঘে ফিলিস্তিনকে পূর্ণাঙ্গ সদস্যপদ দেওয়ার প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই ভেটো ব্যবহার করেছে। তবে ইউরোপীয় দেশগুলোর অবস্থান পরিবর্তন হয়তো যুক্তরাষ্ট্রকেও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে ফিলিস্তিনকে জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্য হিসেবে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলেও বাস্তবে তাদের সামনে এখনো বহু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। পশ্চিম তীর ও গাজা এখনো দখলদারিত্বের মধ্যে রয়েছে। সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, জেরুজালেমের মর্যাদা, শরণার্থী সমস্যা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন ফিলিস্তিনিদের সবচেয়ে বড় বাধা। গাজায় হামাস এবং পশ্চিম তীরে ফাতাহ—এই দুটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর দ্বন্দ্ব ফিলিস্তিনের অভ্যন্তরীণ ঐক্যকেও দুর্বল করেছে। ফলে পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা কেবল আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিতে থেমে থাকবে না, বরং দরকার অভ্যন্তরীণ ঐক্য ও সুদৃঢ় রাজনৈতিক কৌশল।
বিশ্বশক্তিগুলো যদি আন্তরিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসে, তবে ফিলিস্তিনিদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূর্ণাঙ্গ রূপ পেতে পারে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ফিলিস্তিনের পক্ষে ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ এবং ইসরায়েলের প্রতি চাপ প্রয়োগ এখন সময়ের দাবি। কেবল স্বীকৃতি নয়, বরং দখলদারিত্ব বন্ধ করা এবং দুই-রাষ্ট্র সমাধান বাস্তবায়নই হতে হবে মূল লক্ষ্য।
স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ফিলিস্তিনের জন্য এক ঐতিহাসিক সাফল্য। তবে এটিই চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়, বরং দীর্ঘ সংগ্রামের এক নতুন অধ্যায়। দখলদারিত্বের অবসান, সীমান্ত নির্ধারণ, জেরুজালেমের মর্যাদা নির্ধারণ এবং শরণার্থীদের পুনর্বাসন—এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা না করলে পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রের স্বপ্ন বাস্তব হবে না।
তবুও বলা যায়, সাম্প্রতিক স্বীকৃতি ফিলিস্তিনিদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে এবং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লড়াইকে আরও জোরদার করেছে। এখন প্রয়োজন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় ভূমিকা এবং ফিলিস্তিনের অভ্যন্তরীণ ঐক্য। কেবল তখনই তারা তাদের বহু কাঙ্ক্ষিত স্বাধীন রাষ্ট্রের বাস্তব রূপ দেখতে পারবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন